পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দ যখন সারা দেশের মানুষের মনে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে দিয়েছে, তখন পারস্য উপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ের মাঝখানে দুঃখজনক সময় কাটাচ্ছেন বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’র ৩১ জন নাবিক। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে, ঈদুল ফিতরের পরে এবার কোরবানির ঈদও তারা বিদেশের লোনা জলের মধ্যে কাটাতে বাধ্য হয়েছেন। বুধবার সকাল ১০টায় স্থানীয় সময় যখন জাহাজের নেভিগেশন ব্রিজে ঈদের জামাত শুরু হয়, তখন নাবিকদের মন প্রবলভাবে পরিবারের কাছে ফিরতে না পারার দুঃখে ভারাক্রান্ত ছিল। জাহাজের ক্যাপ্টেন মো. শফিকুল ইসলাম খানসহ সবাই এক সঙ্গে সারিবদ্ধ হয়ে ধর্মীয় অনुष্ঠান আদায় করেন, যেখানে ছিল তাদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার ঠিক সেই আলোর প্রত্যাশা।
এই সংঘর্ষের সূচনা হয় ২৭ ফেব্রুয়ারি কাতার থেকে স্টিল কয়েল নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছানোর পর থেকে। এর পরদিনই মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষ শুরু হলে, এই জাহাজটি ভূ-রাজনৈতিক জটিলতায় আটকা পড়ে। যুদ্ধবিরতি হলেও হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কঠোর বিধিনিষেধের কারণে ‘বাংলার জয়যাত্রা’ এখনও অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। অন্য দেশের অনেক বাণিজ্যিক জাহাজ এই পরিস্থিতি অতিক্রম করতে পারলেও রহস্যজনক কারণে বাংলাদেশের এই জাহাজের জন্য ছাড়পত্র পাচ্ছে না authorities।
নাবিকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের সরকার নিরলস কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালালেও পারস্য উপসাগর থেকে তাদের বের করে আনতে কোনো সফলতা আসেনি। প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদ কাটানোর উচ্চাশা থাকলেও, বাধ্য হয়ে জাহাজে ঈদের উৎসব পালন করতে হয়েছে। বিশেষ খাবার ও একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি থাকলেও, প্রিয়জনের সান্নিধ্য না পাওয়ার দুঃখ এই উদযাপনকে ছন্দহীন করে দেয়। জাহাজের প্রতিটি কোণ এখন দীর্ঘশ্বাসে ভারী, যেখানে নাবিকেরা দিন গুনছেন শুধু ফিরে যাওয়ার আশায়।
ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তারা তিন মাস ধরে অনিশ্চিত অবস্থায় সাগরে ভাসছেন। কবে এবং কেমনভাবে হরমুজ প্রণালি পার হতে পারবেন, সে প্রশ্নের যতটা উত্তর প্রয়োজন, এখন পর্যন্ত তার সবই অজানা। প্রতিদিন কাটছে তাদের জন্য অনেক দীর্ঘ, যেন এক যুগের সমান। তারা স্বজনদের কাছে ফেরার জন্য প্রার্থনা করে মোনাজাত করছেন। সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত আরোপিত পদক্ষেপের অপেক্ষায় তারা, যেন দ্রুত মুক্তি পায় এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে।
শেষে বলা যায়, এই ৩১ জন নাবিকের ঈদ ছিল শুধুই আনুষ্ঠানিকতা, যেখানে প্রকৃত আনন্দ ছিল না। ঈদুল আজহা তাদের জন্য শুধুই এক পরীক্ষা, যেখানে ত্যাগের মহিমাই বেশি প্রকাশ পেয়েছে। বিদেশের সাগরে অবরুদ্ধ এই মানুষের জন্য দেশের মানুষের প্রার্থনা ও কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপই এখন একমাত্র আশা। যতক্ষণ না ছাড়পত্র মিলছে, ততক্ষণ পারস্য উপসাগরের দিগন্তজোড়া জলই হবে তাদের অস্থায়ী ঠিকানা।






