ভোলা-২ (বোরহানউদ্দিন-দৌলতখান) আসনের সংসদ সদস্য মো. হাফিজ ইব্রাহিম জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে আলোচনায় অংশগ্রহণ করে উপকূলীয় ও চরাঞ্চলের উন্নয়নে একঝাঁক বাস্তবমুখী প্রস্তাব তুলে ধরেন। তিনি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, নদীভাঙন রোধ, স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালীকরণ, জ্বালানি নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন এবং ভোলাকে জাতীয় পর্যায়ে উন্নয়নের কেন্দ্রে পরিণত করার নানামুখী পরিকল্পনা পেশ করেন।
বাজেট বক্তৃতার শুরুতেই তিনি মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য আত্মত্যাগকারী শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন।
হাফিজ ইব্রাহিম বলেন, দেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে। ভোলা তথা মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর তীব্র ভাঙনের কারণে বহু পরিবার বারবার বসতভিটা ও জীবিকার উৎস হারাচ্ছে। তিনি জানান, তার নির্বাচনী এলাকায় অন্তত ১০টি ইউনিয়ন সক্রিয়ভাবে নদীভাঙনের ঝুঁকির মুখে রয়েছে। সেই অনুযায়ী নদীভাঙন রোধ, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও চরাঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বিশেষ বরাদ্দের দাবি জানান তিনি।
কৃষি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি একসঙ্গে চালিয়ে নিতে তিনি একটি জাতীয় ‘এগ্রি-সোলার’ নীতি প্রণয়নের প্রস্তাব দেন। একই জমিতে কৃষি ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সমন্বয়ের মাধ্যমে খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া ছাড়াও স্থানীয় পর্যায়ে নতুন কর্মসংস্থানের সুফল পাওয়া যাবে—এই বিশ্বাস ব্যক্ত করেন তিনি।
উপকূলীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়াতে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট কোস্টাল গভর্ন্যান্স ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরও জোর দেন তিনি। এতে দুর্যোগ পূর্বাভাস, জরুরি সেবা সমন্বয় ও উপকূলীয় প্রশাসনের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে বলে তার বক্তব্য।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ আর বদ্বীপ অঞ্চলের উদাহরণ টেনে তিনি প্রধানমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রীর কাছে বাংলাদেশের চরাঞ্চলগুলোর জন্য পৃথক তহবিল গঠনের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাই তিনি ‘চরাঞ্চল উন্নয়ন তহবিল’ হিসেবে একটি সার্বিক তহবিল গঠনের জোর দাবি জানান, যাতে সেখানে দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো ও জীবনমান উন্নয়ন করা যায়।
জলবায়ু পরিবর্তন ও ব্লু-ইকোনমিকে ভবিষ্যতের অর্থনীতির মূল খাত হিসেবে উল্লেখ করে তিনি ভোলায় একটি ‘জলবায়ু পরিবর্তন ও ব্লু-ইকোনমি বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও দেন। এই প্রতিষ্ঠান সমুদ্রবিজ্ঞান, পরিবেশ, নাবিকতা ও জৈব-সম্পদ ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলিতে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
জ্বালানি খাতেও ভোলার সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে হাফিজ ইব্রাহিম বলেন, নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার ও গ্যাসভিত্তিক শিল্পায়নের মাধ্যমে ভোলাকে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার কেন্দ্রগুলোর একটি হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। সে লক্ষ্যে বোরহানউদ্দিনে একটি এনার্জি টার্মিনাল ও দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের দাবি তিনি জানান।
স্বাস্থ্যখাত উন্নয়নে তিনি বোরহানউদ্দিন ও দৌলতখানের ১০০ শয্যায়াগ্রস্থ হাসপাতালগুলোর চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসংবলিত করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি প্রস্তাবিত ভোলা মেডিকেল কলেজটি বোরহানউদ্দিন ও লালমোহনের মধ্যবর্তী কোনো কৌশলগত স্থানে স্থাপনের দাবি করেন, যাতে সহজে সবচেয়ে বেশি মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা যায়।
তরুণ সমাজকে মাদক ও অপরাধ থেকে দূরে রাখতে এবং বিস্তৃত ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম সচল করতে তিনি ভোলা-২ এলাকায় একটি আধুনিক মাল্টিপারপাস স্টেডিয়াম নির্মাণের প্রস্তাব দেন। একই সঙ্গে কৃষি আধুনিকীকরণের জন্য একটি হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপনের কথা বলেন, যা স্থানীয় কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও উদ্ভিদচাষের আধুনিক প্রযুক্তি পৌঁছে দেবে।
বক্তৃতার সমাপ্তিতে হাফিজ ইব্রাহিম জাতীয় ও রাজস্ব বাজেটে উপকূলীয় উন্নয়ন, জলবায়ু অভিযোজন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানকে বেশি ওজন দেয়ার আহ্বান চান এবং জনমানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণে বাজেট প্রণয়নের জন্য অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান। তিনি পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, ‘দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য উপকূলীয় ও চরাঞ্চলকে উন্নয়নের মূলধারায় আনতেই হবে।’
বর্তমানে ভোলা-২ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে হাফিজ ইব্রাহিম জাতীয় সংসদে এই অংশগ্রহণ ও প্রস্তাবনা উপস্থাপন করছেন।






