টানা বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বন্যার অবনতি দেখা দিচ্ছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগ এবং এগুলোর তৎসংলগ্ন ভারতীয় উজানে (ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গ) আগামী দিনগুলোতে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে কয়েকটি নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে এবং নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা ছড়াতে পারে। বুধবার (৮ জুলাই) কেন্দ্রের এক বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
ফেনী ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় উদ্বেগ বাড়ছে। টানা বর্ষণ ও উজান ঢলে মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনীয়া নদীর পানি আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলছে। এ কারণে ফেনীর পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলার নদীতীরবর্তী বহু এলাকা নতুন করে প্লাবিত হতে পারে—স্থানীয় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বাড়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, প্রতি বছরই মুহুরী ও কহুয়া নদীর বাঁধ ভেঙে ফুলগাজী ও পরশুরামের বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়; গভীর রাতে হঠাৎ পানি ঢুকলে গবাদিপশু, আমনের বীজতলা, মৎস্য ঘের ও বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
জেলা আবহাওয়া কর্মকর্তা মুজিবুর রহমান জানিয়েছেন, মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ওই অঞ্চলটিতে বৃষ্টিপাত আরও কয়েকদিন ধরে থাকবে। ফেনী পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মনিরুল ইসলাম বলেন, বৃষ্টি ও উজান ঢল অব্যাহত থাকলে নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে—তাই তারা বাঁধ ও পানির উচ্চতা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছেন এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসনও জরুরি সভা ডেকে আগাম প্রস্তুতি শুরু করেছে।
সুনামগঞ্জসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও নদ-নদীর পানি বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের মনু, ধলাই, খোয়াই, কংস, সারিগোয়াইন, সোমেশ্বরী, যাদুকাটা ও ভুগাই নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পেয়েছে এবং আগামী তিন দিনের মধ্যে এসব নদীর পানিও দ্রুত বাড়তে পারে। বন্যা পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টায় সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহের কয়েকটি স্থানে নদী পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, বুধবার সকাল ৯টায় সুনামগঞ্জে একদিনে ১০০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। জেলার মধ্যনগর উপজেলার মহেশখলা এলাকায় ১০২ মিলিমিটার, দিরাই উপজেলায় ১১০ মিলিমিটার বৃষ্টি দেখা গেছে। সুরমা নদীর পানি দুটি পয়েন্টে ৩৩ ও ৩৫ সেন্টিমিটার বেড়েছে। সুনামগঞ্জ শহরের ষোলঘর পয়েন্টে সুরমা নদী বর্তমানে বিপৎসীমার ১.০৮ মিটার নিচ দিয়ে ৬.৭১ মিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে। ছাতক সদর এলাকায় ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হয় এবং সুরমার পানি সেখানে ৩৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ০.৯৭ মিটার নিচ দিয়ে চলছে। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. এমদাদুল হক বলেছেন, মেঘালয়ের উজানে আরও তিন দিন অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে; তাতে নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমা অতিক্রম করলে স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।
বান্দরবানে দুই দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে। বান্দরবানে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার ১৩৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে। পাহাড়ি ছড়ার পানির বৃদ্ধি কয়েকটি নিম্নাঞ্চল প্লাবিত করেছে; নদীর তীরবর্তী বসতঘর ও শত শত একর ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। আলীকদম সদর ও চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের কিছু এলাকা, রেপারপাড়া ও শীবাতলী অংশে সড়কের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় যান চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। স্থানীয়দের ভ্যানগাড়ি ও নৌকায় করে পারাপার করতে দেখা গেছে।
আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনজুর আলম জানিয়েছেন, বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করে মানুষকে সতর্ক করা হচ্ছে। সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় ১৫টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটসহ ত্রাণসামগ্রী মজুদ আছে। জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিতভাবে কাজ করছে। থানচি উপজেলার ত্রিমুখী পর্যটন এলাকায় (তিন্দু, রেমাক্রী, নাফাখুম, আমিয়াখুম) শতাধিক পর্যটক আটকা পড়ার খবরও পাওয়া গেছে; সাঙ্গু নদীর স্রোত স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তাদের নিরাপদ স্থানান্তর সীমাবদ্ধ হচ্ছে। জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস জানিয়েছেন, বান্দরবান জেলায় সমন্বয় করে জরুরি কাজে ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র রাখা হয়েছে।
উত্তরাঞ্চলে রংপুর বিভাগের তিস্তা নদীর পানি গত ২৪ ঘণ্টায় সমতল বৃদ্ধি পেয়েছে। ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি সাময়িকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। বন্যা পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী ২৪-৪৮ ঘণ্টায় তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে এবং নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুরের নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। আগামী ৭২ ঘণ্টায় লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি সতর্কসীমায় প্রবাহিত হয়ে কিছু নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জেলা-উপজেলা প্রশাসন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ফায়ার সার্ভিস, সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে। আবহাওয়া অফিস স্থানীয় বাসিন্দাদের নদীতীর, পাহাড়ের পাদদেশ ও প্লাবিত সড়ক এড়িয়ে চলার এবং প্রয়োজন ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় না যাওয়ার অনুরোধ করেছে।
টানা বর্ষণে রেলওয়ে লাইনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারগামী চার জোড়া ট্রেন (সৈকত এক্সপ্রেস, কক্সবাজার এক্সপ্রেস, প্রবাল এক্সপ্রেস ও পর্যটক এক্সপ্রেস) বাতিল করা হয়েছে। নগরের মুরাদপুর এলাকার সুন্নিয়া মাদরাসাসংলগ্ন অংশে রেললাইন প্রায় দুই ফুট পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় ষোলশহর-জান আলীহাট সেকশনে ট্রেন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়া ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দফতরের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে—যতক্ষণ পর্যন্ত প্রবাহিত পানির মাত্রা বেশি এবং বজ্রসহ ভারী বৃষ্টি থাকছে ততক্ষণ সতর্ক থাকা প্রয়োজন। নদীসংলগ্ন মানুষকে দ্রুত পর্যবেক্ষণ করা, আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা এবং জরুরি সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে জানানো হয়েছে।






