মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ার কারণে সমুদ্রে আটকে থাকা রাশিয়ার তেল কেনার ওপর ভারতের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন এড়াতে ওয়াশিংটন এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ৩০ দিনের জন্য ভারতকে বিশেষ ছাড় দিয়েছে, যাতে সমুদ্রে আটকে থাকা রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ক্রয় করা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বলেন, এ সিদ্ধান্ত মূলত বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য, এটি তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে একটি “ইচ্ছাকৃত স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ”।
পরিস্থিতি ক্রমশ বাড়ছে কারণ ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর হরমুজ প্রণালির আশপাশে লাখ লাখ ব্যারেল তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজ আটকে পড়ে। ভারত তাদের মোট অপরিশোধিত তেল ও গ্যাস আমদানির প্রায় অর্ধেক এই পথ দিয়েই নিয়ে আসে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তেহরান ওই পথ ধরে চলাচলকারী জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলার হুমকি দিয়েছে।
স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, এই সাময়িক ছাড় রাশিয়ার জন্য বড় আর্থিক সুবিধা তৈরি করবে না, কারণ এতে কেবল সমুদ্রে আটকে থাকা তেলের লেনদেনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, “ইরান বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহকে জিম্মি করার যে চেষ্টা করছে, এই সাময়িক ব্যবস্থার ফলে সেই চাপ কিছুটা কমবে।”
হরমুজ প্রণালির অনিশ্চয়তার কারণে ভারতে জ্বালানি সংকট দেখা দেবার বিষয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। দেশের গণমাধ্যম জানিয়েছে, বর্তমানে ভারতের মজুদে অপরিশোধিত তেল ও গ্যাস প্রায় ২৫ দিন ব্যবহারের মতো রয়েছে। একই সময়ে দেশের শীর্ষ গ্যাস আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান পেট্রোনেট এলএনজি জানিয়েছে, তাদের এলএনজি ট্যাংকার কাতারের রস লাফান টার্মিনালে পৌঁছাতে পারছে না। রয়টার্স জানিয়েছে, ভারতের গ্যাস কর্তৃপক্ষ এবং ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন ইতোমধ্যে শিল্প গ্রাহকদের কাছে গ্যাস সরবরাহ কমাতে শুরু করেছে।
ভারতের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানিনির্ভর। প্রতিদিন প্রায় ২৫–২৭ লাখ ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে, যা মোট আমদানির প্রায় অর্ধেক। এই তেলের বড় অংশ আসে ইরাক, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত থেকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হলে ভারতের জ্বালানি সরবরাহে বড় সংকট দেখা দিতে পারে; ফলস্বরূপ দাম বাড়তে পারে এবং রাজস্বগত সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে।
বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলার’র প্রধান বিশ্লেষক সুমিত রিতোলিয়া জানিয়েছেন, যদি সরকারি ছাড় কার্যকর হয় তাহলে সমুদ্রে থাকা রাশিয়ার প্রায় ১৪৫ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বাণিজ্যিক চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর ভারতের বন্দরের দিকে পাঠানো হতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করেছেন, “এই ছাড় মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহের ওপর ভারতের কাঠামোগত নির্ভরতায় মৌলিক কোনো পরিবর্তন আনবে না। ”
বর্তমানে ভারতের মোট তেল আমদানি’র প্রায় ২০ শতাংশই রাশিয়া থেকেই আসে। রাশিয়ার তেল কেনা নিয়ে আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্র চাপ সৃষ্টি করেছে; তাদের দাবি ছিল, রাশিয়া তেল বিক্রি থেকে যে রাজস্ব করে তা ইউক্রেইন যুদ্ধে ব্যবহার হচ্ছে। একই প্রেক্ষিতে, কয়েকদিন আগে রাশিয়ার তেল কেনার অভিযোগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তখনকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতের ওপর শুল্ক আরোপ করেছিলেন—সম্প্রতি মার্চে তিনি জানিয়েছিলেন ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, যার মধ্যে ২৫ শতাংশ রাশিয়া থেকে তেল আমদানির কারণে যুক্ত ছিল। ট্রাম্প তখন বলেছিলেন, ভারত রাশিয়া থেকে তেল কিনে ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টায় অর্থ যোগাতে সহায়তা করছে।
ভারত বরাবরই তুলে ধরেছে যে রাশিয়ার তেল কেনা তাদের জাতীয় জ্বালানিচাহিদা মেটানোর কারণে জরুরি এবং বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে ব্যবসা করার অধিকার তাদের রয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ থেকে ভারত ধীরে ধীরে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল আমদানি কমাতে শুরু করেছে এবং একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল কেনা বাড়িয়েছে।
সূত্র: বিবিসি






