ইরান ঘোষণা করেছে যে লেবাননে চলমান যুদ্ধবিরতির সময় সব বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্টে এই ঘোষণা দেন এবং জানান, এই রুটে নৌ চলাচল ইরানের বন্দর ও সামুদ্রিক সংস্থার পূর্বঘোষিত সমন্বিত রুট অনুযায়ী পরিচালিত হবে। বহুবিধ কূটনৈতিক নির্দেশনা মেনেই এটি করা হবে—এমন ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, লেবাননে শান্তি ফেরাতে হওয়া সাময়িক যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে ইরান এমন নমনীয় অবস্থান নিয়েছে।
আরাগচির ঘোষণার সময় সংকেত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে; কিন্তু তার কিছুক্ষণের মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালেই লিখেন, “হরমুজ প্রণালি ব্যবসা-বাণিজ্য ও যাতায়াতের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ও প্রস্তুত। তবে ইরানের বিরুদ্ধে নৌ-অবরোধ পূর্ণ শক্তিতে বজায় থাকবে এবং এটি তখনই উঠবে যখন আমাদের সঙ্গে ইরানের সকল লেনদেন ১০০ শতাংশ বন্ধ হবে।” ট্রাম্পের এ মন্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে পথ খোলা গেলেও সামরিক বা অর্থনৈতিক চাপের অবস্থান এখনো অব্যাহত থাকতে পারে—বিশেষভাবে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের প্রেক্ষিতে।
পটভূমি হিসেবে বলা প্রয়োজন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালায়—তরুণ অঞ্চলে উত্তেজনা বৃদ্ধির শুরু হয়। এরপর ২ মার্চ থেকে ইসরায়েল লেবাননের ওপর তীব্র অভিযান শুরু করলে বড় ধ্বংসযজ্ঞ হয়। উভয় পক্ষের আঘাতের পর ৮ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের জন্য একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়; ওই চক্র শেষ হওয়ার কথা ২১ এপ্রিল। যুদ্ধবিরতি চুক্তি চূড়ান্ত করতে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রায় ২১ ঘণ্টার সরাসরি আলোচনা সম্পন্ন হয়, কিন্তু পারমাণবিক ইস্যু এবং হরমুজে ইরানের নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত বিতর্কসহ কিছু কারণের জন্য চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানো যায়নি। আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বেশ কিছু বন্দরে অবরোধ আরোপ করে।
হরমুজ প্রণালির গতিবিধি বিশ্ব জ্বালানি বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলে। যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিনের মধ্যে ইরান এই সরু জলপথ বন্ধ করে দিলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ভাঙচুরের আভাস দেখা দেয়। যুদ্ধের আগে হরমুজের মাধ্যমে পৃথিবীর মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ (প্রায় ২০%) পরিবহন হতো; দৈনিক প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য জ্বালানি এই পথে যেত। প্রণালিটি কার্যত বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গিয়েছিল, যা বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।
ইরানের হরমুজ খোলার ঘোষণার প্রভাব দ্রুত পড়েছে: আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এক দফায় বড়ো হারে কমে। বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ঘোষণার পর থেকেই দরপতন শুরু হয়—ব্রেন্ট ক্রুড প্রতি ব্যারেল ১০.৫৯ ডলার (প্রায় ১০.৭%) কমে ৮৮.৮০ ডলারে নেমে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI) ক্রুডও ১০.৮০ ডলার (প্রায় ১১.৪%) ঝরে প্রতি ব্যারেল ৮৩ ডলারে নামছিল।
তেলের পাশাপাশি শেয়ারবাজারেও ইতিবাচক প্রভাব দেখা যায়। ডাও জোন্স সূচক ৭৪৫ পয়েন্ট বা ১.৫৪ শতাংশ বেড়েছে, এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক প্রায় ০.৯ শতাংশ বাড়ি, আর নাসডাক সূচকও প্রায় ১ শতাংশের কাছাকাছি উন্নতি দেখায়। সিএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গত ৩০ মার্চের সর্বনিম্ন অবস্থান থেকে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ১১ শতাংশের বেশি উঠে এসেছে—এটা মার্কেটের পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত।
হরমুজ প্রণালির ভৌগলিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। পারস্য উপসাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করা এই সরু জলপথ ইরান ও ওমানের মাঝেই অবস্থিত এবং বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের মূল ধমনি হিসেবে বিবেচিত। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (IEA) তথ্য মতে, এই পথে পরিবাহিত তেলের প্রায় ৭০ শতাংশই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ভোক্তা মানুষের জন্য যাচ্ছে—এদের মধ্যে রয়েছে চীন, জাপান, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও ফিলিপাইন। পাশাপাশি বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কাও মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরাসরি অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। ফলে হরমুজে কোনো সঙ্কট উঠলে এসব দেশের জ্বালানি বাজারেও তা দ্রুত প্রতিফলিত হয়।
সংক্ষেপে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার ঘোষণা আন্তর্জাতিক বাজারে অবিলম্বে দরপতনের কারণ হয়েছে এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। তবু রাজনৈতিক তণাবন্ধন, নৌ-অবরোধ ও কূটনৈতিক সমাধানের অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে—যা ভবিষ্যতে বাজারের দিক নির্ধারণ করবে।






