সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প লোডশেডিং ও জ্বালানি সংকটে ক্রমশ ধস নামছে। আগে একটি জামদানি শাড়ি তৈরিতে বিদ্যুৎ চালিত পাওয়ার লুমে জ্বালানি খরচ ছিল মাত্র ৪০ টাকা। এখন ডিজেল চালিত জেনারেটরে কাজ করাতে সেই খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬০ টাকায় — অর্থাৎ চারগুণ বৃদ্ধি। দীর্ঘদিন ধরে তাঁত ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত খামারগ্রামের ব্যবসায়ী আলহাজ আফজাল হোসেন লাভলু জানিয়েছিলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট তাঁতশিল্পকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) সকালে বেলকুচির জামান টেক্সটাইলের কারখানায় সরেজমিনে দেখা গেছে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় বিদ্যুৎ চালিত তাঁতগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। পাওয়ার লুমের শ্রমিকরা বাইরে বসে সময় কাটাচ্ছেন—লুডু খেলা, মোবাইল ফোনে গান শোনা বা অলসভাবে অপেক্ষা করছে। তাঁতশ্রমিক মহির উদ্দিন বলেন, ‘লোডশেডিংয়ের কারণে কাপড় তৈরি করা যাচ্ছে না। অধিকাংশ সময়ে বিদ্যুৎ নেই, তাই সংসারের খরচ চালাতে কষ্ট হচ্ছে, দেনা করে চলছি।’
আরেক শ্রমিক সাজেদুল বলেন, ‘বিদ্যুৎ না থাকায় তাঁত বন্ধ। ডিজেলও মেলছে না, তাই মেশিন চালানো যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে লুডু খেলেই সময় পার করছি।’ মালিক আব্দুল্লাহ জানান, ‘অতিরিক্ত মূল্য দিয়েও চাহিদামতো জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না।’ প্রান্তিক পর্যায়ের ছোট মালিকদের জন্য সৌজন্যেই উৎপাদন আজ কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে; অনেকেই অর্ডার সময়মতো দেওয়ার অক্ষমতায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, কেউ কেউ পেশা বদল করার কথা ভাবছেন।
শিল্প সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, এক সময় সিরাজগঞ্জ জেলার তাঁত কুঞ্জ ব্র্যান্ডিং হিসেবে পরিচিত ছিল। বেলকুচি ও এনায়েতপুরসহ জেলার ৯টি উপজেলায় প্রায় ১৫ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পাওয়ারলুম ও হ্যান্ডলুম মিলিয়ে জেলায় প্রায় পাঁচ লাখ তাঁত থাকলেও, অব্যাহত লোডশেডিং, জ্বালানি সংকট, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ও বাজার অস্থিরতার কারণে অনেক তাঁতকল ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে।
জেলা অভ্যন্তরে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে তাঁতে কাপড় উৎপাদন প্রায় অর্ধেক নেমে এসেছে, আর জ্বালানি খরচ বেড়ে কয়েকগুণ। দিনের অধিকাংশ সময়ে বিদ্যুৎ না থাকায় শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়ছেন। উৎপাদন কমে যাওয়ায় অর্ডার মিস হচ্ছে, ব্যাংক লোন নিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করলেও অনেক ছোট উদ্যোক্তা বন্ধ হওয়ার পথে।
জাতীয় তাঁতী সমিতির সভাপতি আলহাজ আব্দুস ছামাদ খান জানান, ‘বড় বড় কারখানাগুলো চড়া দামে ডিজেল কিনে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু প্রান্তিক তাঁতিদের প্রয়োজনীয় সমাধান না দিলে তারা বাঁচবে না। জেলার পাঁচ লাখ তাঁতের মধ্যে জেনারেটর চালিত ও হস্তচালিত প্রায় দুই লাখ বাদে বাকিরা বন্ধ হওয়ার পথে। এতে কয়েক লাখ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়তে পারেন। দ্রুত সমাধান না হলে ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প ধ্বংসস্তুপে পরিণত হবে।’
স্থানীয়রা দাবি করেন—প্রতিষ্ঠানিক সহায়তা, সাশ্রয়ী জ্বালানি ও স্থায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ না হলে তাঁতশিল্পকে রক্ষার কোন উপায় থাকবে না। তাঁতশিল্পের বহু পরিবারই আজ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মোকাবিলা করছে এবং দ্রুত উদ্যোগ না নিলে এ ঐতিহ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।






