দেশে সঠিক সময়ে টিকা এবং ভিটামিন A না পাওয়ার ফলে হাম রোগের প্রকোপ ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে, শিশুর মৃত্যু এখনও অব্যাহত রয়েছে। সেই সঙ্গে আক্রান্তের সংখ্যাও বেড়ে চলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপুষ্টির কারণে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। বিশেষ করে মা-এর বুকের দুধ খাওয়ানোর হার কমে যাওয়ায় শিশুদের অরক্ষিত অবস্থার কিছুটা চিত্র উঠে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে গত এক দিনে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু ঘটে। এর মধ্যে চারজন হাম আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন, আর সাতজন উপসর্গ নিয়ে মারা যান। এর ফলে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০৯ জনে। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ও সংশ্লিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই হিসাব প্রকাশ করা হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, শনিবার সকাল আটটা থেকে রোববার সকাল আটটা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে চারজনের নিশ্চিত হাম রোগের চিকিৎসা নেওয়া হলেও বাকিরা উপসর্গের কারণে মারা যান। ডেটা অনুযায়ী, আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা এখন ৬৫ জন। হামের উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা ৩৪৪ জন। মোট মৃত্যুর সংখ্যা এখন ৪০৯। নতুন করে আরো ২০৫ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। এই সময়ে দেশে মোট হাম রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৮১৯ জনে, আর হামের উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫০৩। এর সঙ্গে সন্দেহভাজন সংক্রমণের সংখ্যা মোট ৪৯ হাজার ১৫৯ জনে পৌঁছেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আরও জানিয়েছে, আগের দিনের তুলনায় সন্দেহজনক হামে মৃত্যুর হার বেড়েছে। শনিবার এই সংখ্যা ছিল ২৯১, যা রোববার বেড়ে ৩৪৪-এ পৌঁছেছে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ, রংপুর মেডিকেল কলেজ ও বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য, পাশাপাশি সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে এসব হিসাব প্রকাশ করা হয়।
শিশুস্বাস্থ্য ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হাম প্রতিরোধযোগ্য রোগ। সময়মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে এই সংখ্যক মৃত্যুর সংখ্যা অনেকাংশে কমানো সম্ভব ছিল। টিকা, পাশাপাশি পুষ্টি ও পরিচর্যার মাধ্যমে শিশুর রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করা যায়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন মন্তব্য করেন, শিশুদের ওপর নানা অন্যায় করা হয়েছে। মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর প্রচার ও ভিটামিন A ক্যাম্পেইন শোবদ্দুর মতো কার্যক্রম সঠিক সময়ে চালানো হয়নি, কৃমিনাশকও ঠিকভাবে খাওয়ানো হয়নি। এসব কারণে অপুষ্টির পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। এর উপর হামর টিকা সঠিক সময়ে না পাওয়ায় শিশুরা অরক্ষিত অবস্থায় থাকে। এর ফলস্বরূপ এই ভয়াবহ পরিস্থিতি ও মৃত্যুর হার বর্ধমান হয়েছে।
জানা গেছে, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) মাধ্যমে নিয়মিতভাবে দেশের ৯ মাস বয়সী শিশুদের প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ হাম রোগের টিকা দেওয়া হয়। তবে, টিকার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হলে ৯৫ শতাংশ শিশুকে এই টিকা দেওয়া প্রয়োজন—কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তা সম্ভব হচ্ছে না। ২০২৩ সালের ইপিআইয়ের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সম্পূর্ণ টিকা পাওয়ার হার ৮২ শতাংশ। অর্থাৎ, ১৮ শতাংশের বেশি শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব শিশুরা টিকার বাইরে পড়ে যাচ্ছে তাদের মধ্যে ৮৫ শতাংশই পাঁচ বছরের নিচে বয়সী। আরও উদ্বেগজনক হলো, আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৬৫ শতাংশ কোনো টিকা পায়নি। আংশিক টিকা নেওয়া শিশুদের সংখ্যা ২১ শতাংশ। এইভাবে, টিকাবঞ্চিত শিশুর সংখ্যা বছরে বছরে আরও বেড়ে যাচ্ছে, যা হামের মতো রোগের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের কারণ।
শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক শিশু বিভাগের প্রধান আবিদ হোসেন মোল্লা জানাচ্ছেন, ভিটামিন A শিশুর জন্য অতিভালুক্য। এটি কোষের কার্যক্ষমতা রক্ষা করে, চোখের পানি তৈরি ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা প্রতিরোধে সাহায্য করে। ভিটামিন A এর অভাবে রাতকানা রোগ, চোখের মারাত্মক সমস্যা হতে পারে। পাশাপাশি, এটি রোগপ্রতিরোধকেও গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে।
পুষ্টিবিদরা জানিয়েছেন, দেশের বেশিরভাগ মানুষ—সাড়ে ৭ শতাংশের বেশি—ভিটামিন A এর ঘাটতিতে ভোগে, যেখানে শিশুদের হার আরও বেশি। শিশুদের এই ঘাটতি দূর করতে প্রতি বছর দুইবার ভিটামিন A ক্যাম্পেইন চালানো হয়। কিন্তু, গত অন্তর্বর্তী সরকারকালে এসব ক্যাম্পেইন সঠিক সময়ে আয়োজন হয়নি।
সরকারের জাতীয় পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মো. ইউনুস আলী বলেন, সর্বশেষ ভিটামিন A ক্যাম্পেইন হয় ২০২৫ সালের মার্চ মাসে। এরপর তার পরে দ্বিতীয় ক্যাম্পেইনের পরিকল্পনা থাকলেও, সেটি এখনো সম্পন্ন হয়নি। ভিটামিন A এর অভাবে শিশুরা মায়ের বুকের দুধেরও সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
তাজুল এ বারি বলেন, মায়ের দুধ রোগের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। প্রথম ছয় মাসে মা-য়ের দুধ ছাড়া অন্য কোনও খাবার দেওয়া উচিত নয়। তবে, দেশের অনেক শিশু এই আদর্শ নিয়মের বাইরে রয়েছে। এই হার বৃদ্ধি চলমান।
সর্বশেষ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ (২০২২) অনুযায়ী, ষোড়শ মাসে শিশুদের শুধু মায়ের দুধ খাওয়ানোর হার ৫৩ শতাংশ। চার বছর আগে এই হার ছিল ৬৫ শতাংশ। অর্থাৎ, শিশুরা পর্যাপ্তভাবে বুকের দুধ পাচ্ছে না।
আবিদ হোসেন মোল্লা আরও বলছেন, অপুষ্টিতে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। অপুষ্টি রোগের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। না হলে দ্রুত চিকিৎসা না পেলে শিশুর মৃত্যুর ঘটনা বেড়ে যায়।






