‘‘বেশি বয়সেও ত্বক হবে টানটান, কালচে ভাব দূর হবে’’—এমন চটকদার প্রতিশ্রুতি দানের আড়ালে চলছে এক ভয়াবহ ব্যবসা। অনলাইনের গ্ল্যামার ও বিজ্ঞাপনের লোভ দেখিয়ে বাজারে ছড়ানো হচ্ছে নকল ও ভেজাল প্রসাধনী, যার ফলে ক্রেতারা শুধু টাকা হারাচ্ছে না; ত্বক নষ্ট হওয়া, দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ক্ষতি এবং জনস্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছে।
রাজধানীর রামপুরার গৃহিণী আরজু বেগুমের কষ্টের গল্প সেটা নিজের চোখে দেখিয়েছে। ৫৫০ টাকায় তিনি কেনেন ‘‘কোরিয়ান মিল্ক সুথিং জেল’’, এক সপ্তাহ ব্যবহারে তার মুখে ঘামচির মতো ফোলা দানা দেখা দেয়। তিনবার ডাক্তারের কাছে যাওয়ার পরেও পুরোপুরি আরোগ্য পাননি; চিকিৎসার জন্য তিনি খরচ করেছেন অন্তত পাঁচ হাজার টাকা। তিনি বলছিলেন, ‘‘আমি আসল আমদানিকারকের স্টিকার এবং মেয়াদ দেখে বিশ্বাস করে নিয়েছিলাম, তবু প্রতারিত হলাম।’’ আরজুর মতো অনেক ক্রেতাই এই নকল পণ্যে ভুগছেন—টুথপেস্ট থেকে শ্যাম্পু, ফেসক্রিম থেকে পারফিউম—সবকিছুতে ভেজাল মিলছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে যে নকল-প্রসাধনী তৈরির হটস্পটগুলো রাজধানীর চকবাজার, লালবাগ, জিনজিরা, কেরানীগঞ্জ, সাভার ও পুরান ঢাকা-সহ নানা এলাকায় গড়ে উঠেছে। পরিত্যক্ত মোড়ক ও খালি বোতল সংগ্রহ করে সেগুলোতে সাবান-পানি, নিম্নমানের কেমিক্যাল ও কৃত্রিম সুগন্ধি মিশিয়ে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের নাম ও লোগো ব্যবহার করে তৈরি করা হচ্ছে পণ্যগুলো। লরেল, গার্নিয়ার, রেভলন, নিভিয়া, ডাভ, ভ্যাসলিন সহ হুগো, ফেরারি মতো বিলাসবহুল পারফিউম পর্যন্ত নকল হচ্ছে বলে তদন্তে পাওয়া গেছে।
বাজারে এমন নকল পণ্যের সহজলভ্যতা ব্যবসায়ীদের তালুর ওপর আছে—তারা বলছেন, নকল প্রসাধনী তৈরির সঙ্গে জড়িত চক্রগুলোকে শনাক্ত করলেও সাধারণত সামান্য জরিমানা ছাড়িয়ে কঠোর শাস্তি দেওয়া হচ্ছে না। এতে অপরাধীরা আবার একই ব্যবসায় ফিরে আসে। ব্যবসায়ীদের দাবি — শুধু আর্থিক জরিমানা নয়, সম্পদ জব্দ ও কড়াকড়ি শাস্তি দরকার যাতে এই চক্রগুলো ভেঙে পড়ে।
নগরীর বিভিন্ন মার্কেট, শপিংমল ও ফুটপাত ঘেঁটে দেখা যায় নামিদামি ব্র্যান্ডের লিপস্টিক, ফাউন্ডেশন, ফেসক্রিম, পারফিউম ও স্কিন কেয়ার পণ্যগুলো হুবহু নকল করে বিক্রি হচ্ছে। প্যাকেট, লোগো ও ডিজাইন এতটাই নকল করা হয় যে সাধারণ ক্রেতার পক্ষে আসল-নকল আলাদা করা কঠিন। যে ব্র্যান্ডগুলো বেশি নকল হচ্ছে—গার্নিয়ার, লরেল, রেভলন, হেড অ্যান্ড শোল্ডার, নিভিয়া, ডাভ থেকে শুরু করে প্যানটিন, ভ্যাসলিন ও নানা বিলাসবহুল পারফিউমের নাম অন্তর্ভুক্ত।
শাসক সংস্থাগুলোর অভিযানও ঘটেছে। ১০ মার্চ মহাখালী এসকেএস টাওয়ারে জেএস ট্রেডিংসহ দুটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে ভোক্তা অধিদপ্তর প্রাথমিকভাবে সতর্ক করে ৮০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে; পণ্যের প্যাকেটে পর্যাপ্ত লেবেল না থাকায় তাদের সংশোধনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ৩ মার্চ র্যাব-২ মোগাম্মদপুরের আলোচিত শোরুম ‘মেক ইট আপ বাই ফারজানা ইসলাম’-এ অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ নকল কসমেটিকস জব্দ ও শোরুম সিলগালা করেছে। ১৫ এপ্রিল ঝিনাইদহে র্যাব-৬ একটি নকল প্রসাধনী কারখানায় অভিযান চালিয়ে বড় পরিমাণ পণ্য সেপ করে। ১৯ ফেব্রুয়ারি বিএসটিআই পুরান ঢাকার বংশাল এলাকায় অপর একটি নির্মাণশীল স্থাপন থেকে নকল পণ্যের মালের পাশাপাশি খালি বোতল, লেবেল ও ক্ষতিকর কেমিক্যালও জব্দ করেছে।
অর্থনীতিক ভাষ্যে পরিস্থিতি যে মারাত্মক তা বাংলাদেশের ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের পরিসংখ্যানও বলে—দেশে বার্ষিক প্রসাধনী পণ্যের চাহিদা প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকা; এর মধ্যে অন্তত ২৪ হাজার কোটি টাকার অংশ চোরাচালান ও নকল পণ্যে দখল বলে ধারণা করা হয়।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা তড়িঘড়ি সতর্ক করছেন। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এমএন হুদা বলছেন, বাজারে প্রচলিত রং ফর্সাকারী ক্রিমগুলোর বেশিরভাগই ক্ষতিকর; স্থায়ীভাবে রং ফর্সা করার কোনো বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ক্রিম নেই। এসব পণ্যে থাকা রাসায়নিক ত্বক পুড়িয়ে দিতে পারে, ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায় এবং স্নায়ুবিক সমস্যাও ডেকে আনতে পারে। জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী বলেন, ভারী ধাতু—বিশেষত সিসা (লিড) মিশ্রিত পণ্য রক্তে প্রবেশ করে কিডনি বিকল, অপুষ্টি ও প্রজনন ক্ষমতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার পেছনে কখনও কখনও প্রশাসন ও ব্যবসায়িক স্বার্থের আপসঅ রয়েছে; মিডিয়ায় রিপোর্টিং হলে তৎকালীন অভিযান হলেও স্থায়ী পর্যবেক্ষণ ও কঠোর আইন প্রয়োগের অভাব লক্ষ্য করা যায়।
বিশেষজ্ঞরা সাজেশন দেন—ক্রেতাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে, লেবেল ও উৎস যাচাই করা জরুরি, এবং সরকারি অঙ্গসংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কড়া নজরদারি ও পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে। এছাড়া নকল নির্মাতাদের বিরুদ্ধে শুধু জরিমানা নয়, সম্পদের জব্দ, অর্থদণ্ড ও দণ্ডপ্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে বড় মাপের নকল আর ভেজাল পণ্য বাজার থেকে সরানো সম্ভব হবে।
ক্রেতাদের পরামর্শ হচ্ছে—সস্তায় চোখ বাঁচাতে অকপটে সতর্ক থাকুন; সন্দেহ হলে অনুমোদিত দোকান বা সার্টিফায়েড ডিলার থেকে পণ্য নিন এবং যে কোনো ক্ষতি হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। নকল কসমেটিকস শুধু সৌন্দর্যকে নষ্ট করে না, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য ‘নীরব মহামারী’ হয়ে উঠতে পারে—সেটাই সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা।






