হান্টাভাইরাস নিয়ে আগের থেকেই তৎপরতার মধ্যেই বিশ্বজুড়ে নোরোভাইরাস নিয়ে নতুনভাবে উদ্বেগ ছড়িয়েছে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি বহু ক্রুজ জাহাজে ধারাবাহিকভাবে সংক্রমণের খবর প্রকাশিত হওয়ায় এই ভাইরাসটি ফের সংবাদ শিরোনামে এসেছে।
সাম্প্রতিক ঘটনায় ফরাসি কর্তৃপক্ষ বোর্দো বন্দরে নোঙর করা একটি ক্রুজ জাহাজে ১ হাজার ৭০০-এর বেশি যাত্রী ও ক্রুকে কড়াকড়িভাবে কোয়ারেন্টিন আরোপ করেছে। কর্মকর্তারা বলছেন, একজন যাত্রীকে নোরোভাইরাসের সন্দেহজনক কারণে মৃত্যুর পরে এ ব্যবস্থা নেয়া হয়। অ্যাম্বাসেডর ক্রুজ লাইনের ওই জাহাজটি দৌড়েছে শেটল্যান্ড থেকে — বেলফাস্ট, লিভারপুল ও ব্রেস্টে স্টপ করার পর বোর্দোতে পৌঁছায়। জাহাজে উপস্থিত ১ হাজার ২৩৩ যাত্রীর বেশিরভাগই ব্রিটেন ও আয়ারল্যান্ডের নাগরিক; এক প্রতিবেদনে বলা হয় এক ৯০ বছর বয়সি যাত্রী মারা গেছেন এবং প্রায় ৫০ জনের মধ্যে নোরোভাইরাসের উপসর্গ দেখা গেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য ও রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলো গত কয়েক মাসে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে নোরোভাইরাসের একাধিক প্রাদুর্ভাব রিপোর্ট করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি জানায়, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত শত শত প্রাদুর্ভাব নথিভুক্ত হয়েছে। যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা সংস্থা বলেছে, ২০২৫-২৬ মৌসুমে তাদের দেশে সংক্রমণের হার পাঁচ বছরের গড়ের চেয়ে বেশি ছিল, বিশেষ করে হাসপাতালগুলিতে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে।
নোরোভাইরাস কী: মার্কিন রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র (সিডিসি) বলেছে, সাধারণভাবে ‘স্টম্যাক ফ্লু’ নামে পরিচিত এই ভাইরাসটি ইনফ্লুয়েঞ্জা নয়; এটি পাকস্থলি ও অন্ত্রসংক্রান্ত সংক্রমণ ঘটায়। প্রধান উপসর্গগুলো—হঠাৎ বমি, পাতলা পায়খানা, তীব্র বমিভাব, পেটব্যথা, দুর্বলত্ব, মাঝে মাঝে জ্বর ও শারীরিক ব্যথা। সাধারণত উপসর্গ শুরু হয়ে ১২–৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রকাশ পায় এবং অধিকাংশ রোগী ১–৩ দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে যায়। তবে শিশু, বৃদ্ধ ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকলে পানিশূন্যতা ও জটিলতা দেখা দিয়ে হাসপাতালে ভর্তি প্রয়োজন হতে পারে।
নোরোভাইরাস অত্যন্ত সংক্রামক: বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভাইরাসটি খুবই কম পরিমাণেই সংক্রমণ ঘটাতে পারে এবং আক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ হওয়ার পরও কয়েক দিন পর্যন্ত ভাইরাস ছড়াতে পারে। ভাইরাসটি বিভিন্ন পৃষ্ঠে দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে—দরজার হাতল, টেবিল, বাসন-পত্র, বাথরুম বা রান্নাঘরের পৃষ্ঠ থেকেই ছড়াতে পারে। বমির সূক্ষ্ম কণাও বাতাসে ছড়িয়ে গিয়ে অন্যদের সংক্রমিত করতে পারে। তাই ক্রুজ জাহাজ, স্কুল, হাসপাতাল, বৃদ্ধাশ্রম, ক্যাম্পাস বা অন্যান্য ঘনবসতিপূর্ণ স্থানে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলেছে, নোরোভাইরাস এখন বিশ্বব্যাপী তীব্র গ্যাস্ট্রোএন্টারাইটিসের একটি শীর্ষ কারণ। প্রতি বছর আনুমানিক ৬৮ কোটি ৫০ লাখ (৬৮৫ মিলিয়ন) মানুষ এই ভাইরাসে সংক্রমিত হন এবং প্রায় ২ লাখ মানুষ মারা যান, যেখানে মৃত্যুর বড় অংশ নিম্নআয়ের দেশগুলোতে ঘটে। তাছাড়া এর অর্থনৈতিক প্রভাবও বড়—বার্ষিক চিকিৎসাব্যবস্থায় ব্যয় ও কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়ে প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হতে পারে। এজন্য ভ্যাকসিন উন্নয়নকে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত জনস্বাস্থ্য নির্দেশনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চিকিত্সা ও প্রতিরোধ: বর্তমানে নোরোভাইরাসের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ বা অনুমোদিত ভ্যাকসিন নেই; চিকিৎসা প্রাথমিকভাবে উপসর্গনির্ভর। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পর্যাপ্ত তরল ও ইলেকট্রোলাইট দেয়া—হালকা পানিশূন্যতা থাকলে সেটাই প্রতিকার। গুরুতর ক্ষেত্রে শিরায় স্যালাইন দেয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা হলো সাবান ও পানি দিয়ে ভালোভাবে হাত ধোয়া; এনএইচএস ইংল্যান্ড জানিয়েছে শুধু অ্যালকোহলভিত্তিক স্যানিটাইজার যথেষ্ট নয়। খাবার তৈরি করার আগে ও পরে, টয়লেট ব্যবহারের পর এবং কোনো অসুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার পর হাত ভালোভাবে ধোয়া জরুরি। আক্রান্ত অবস্থায় অন্যদের জন্য খাবার না বানানো, ব্যবহার্য কাপড় ও বিছানাপত্র উচ্চ তাপমাত্রায় ধোয়া, বমি বা মল পরিষ্কার করার সময় গ্লাভস ব্যবহার করা—এসব নির্দেশনা মানা প্রয়োজন। নোংরা পৃষ্ঠগুলোকে উপযুক্ত জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা মিলবে।
ঝুঁকি ও সতর্কতা: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদিও নোরোভাইরাস অত্যন্ত সংক্রামক, তবুও এটি কোভিড-১৯-এর মতো বৈশ্বিক মহামারিতে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা কম—এতে মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে কম এবং অধিকাংশ রোগী কয়েক দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠেন। তারপরও ব্যাপক প্রাদুর্ভাব ঘটলে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবার ওপর বড় চাপ পড়ে, বিশেষ করে বৃদ্ধাশ্রম, হাসপাতাল ও অন্যান্য ঘনবসতিপূর্ণ স্থানে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের প্রসঙ্গে, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)-এর সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেছেন যে আমাদের জন্য আপাতত ঝুঁকি খুব কম। তিনি বলছেন, বাংলাদেশের পরিবেশ বা জলবায়ুর কারণে এখন পর্যন্ত নোরোভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকির সঙ্গে কোনো স্পষ্ট সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। তবু জনস্বাস্থ্য সচেতনতা এবং পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করে সতর্ক থাকা জরুরী।
সামগ্রিকভাবে, নোরোভাইরাসকে এড়িয়ে চলার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, আক্রান্ত হলে দ্রুত চিকিৎসা ও বিশ্রাম গ্রহণ এবং জনসমাগম স্থানে সতর্ক থাকা। বিশেষ করে খাদ্য তৈরির সময়ে ও বয়স্ক-বা অসুস্থ ব্যক্তিদের দেখাশোনায় অতিরিক্ত সাবধানতা প্রয়োজন।






