গাজার গণহত্যা ও পশ্চিম তীরে জমি দখলের অভিযোগের পাশাপাশি ইসরায়েলি কারাগারে ফিলিস্তিনিদের ওপর ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের ব্যাপক অভিযোগ সামনে এসেছে। পুলিৎজার বিজয়ী কলামিস্ট নিকোলাস ক্রিস্টফের একটি বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ১৪ জন ফিলিস্তিনি নারী-পুরুষের বর্ণনা তুলে ধরে বলেছে, এসব অত্যাচার কারারক্ষী, সেনা, বসতি স্থাপনকারী ও জিজ্ঞাসাবাদকারীদের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে — এবং এতে শিশুরাও রেহাই পায়নি।
ক্রিস্টফের প্রতিবেদনে সাক্ষ্যদান করা সাংবাদিক সামি আল-সাই বলেন, ২০২৪ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার পর কারারক্ষীরা তাকে বারবার নির্যাতন করে; তাকে বিবস্ত্র করে বিভিন্ন জিনিস দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করা হয় এবং এক ব্যক্তি তার মাথা ও ঘাড়ের ওপর পা দিয়ে চাপ দিয়ে রাখে। তিনি বলেছেন, ‘‘এটা ভীষণ যন্ত্রনা ছিল, আমি মৃত্যুর জন্য প্রার্থনা করছিলাম।’’
আরেক ফিলিস্তিনি কৃষক অভিযোগ করেছেন, যখন তিনি কারারক্ষীদের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ করতে গিয়েছিলেন, তখন ধাতব লাঠি দিয়ে তাকে পেটানো হয় এবং শিন বেতের কর্মকর্তারা তাকে প্রকাশ্যে কথা বলতে নিসেধ করেছিল। ২০২৩ সালে গ্রেপ্তার হওয়া এক নারী বলেছে, তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয়েছিল; তাকে বারবার বিবস্ত্র করে মারধর ও যৌন হয়রানি করা হয়েছিল। গাজার এক সাংবাদিকও আটকাবস্থায় যৌন নির্যাতনের ভয়াবহ বর্ণনা দিয়েছেন এবং বলেছেন, ‘‘কেউ রেহাই পায়নি।’’
ক্রিস্টফ কয়েকজন কিশোরের কথাও তুলে এনেছেন; তাদের মধ্যে একজন ১৫ বছর বয়সি কিশোর বলে, আটক অবস্থায় ধর্ষণের হুমকি ছিল নিয়মিত এবং তাদের বলতেন ‘‘এটা করো, না হলে লাঠিটা তোমার শরীরে ঢুকিয়ে দেব।’’
এই ব্যক্তিগত সাক্ষ্যগুলির সঙ্গে ক্রিস্টফ জাতিসংঘ, মানবাধিকার সংস্থা বিতসেলেম (B’Tselem), সেভ দ্য চিলড্রেন, ইউরো-মেড হিউম্যান রাইটস মনিটর এবং কমিটি টু প্রটেক্ট জারনালিস্টসের রিপোর্টের তথ্য উপস্থাপন করেছেন। ইউরো-মেড এক প্রতিবেদনে ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতাকে ‘পদ্ধতিগত’ এবং ‘রাষ্ট্রসমর্থিত সংগঠিত নীতি’র সঙ্গে সম্পর্কিত বলে আখ্যা দিয়েছে। বিতসেলেমও গুরুতর যৌন সহিংসতার ধারাটির নথিভুক্তি করেছে, আর সেভ দ্য চিলড্রেনের জরিপে হাতে আটক ফিলিস্তিনি শিশুদের অর্ধেকেরও বেশি বলেছেন তারা যৌন সহিংসতা প্রত্যক্ষ করেছেন অথবা এর শিকার হয়েছেন।
তবে এই অভিযোগগুলো ইসরায়েলের কারা কর্তৃপক্ষ প্রত্যাখ্যান করেছে। নিউইয়র্ক টাইমসের বরাতে এক প্রকাশ্য মুখপাত্র এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও বিভূত ও ‘‘ভিত্তিহীন’’ বলে অভিহিত করেছেন।
ক্রিস্টফ বলেন, দায়মুক্তির সংস্কৃতি এসব ধর্ষণ ও নির্যাতন চালিয়ে যাওয়ায় সহায়ক হচ্ছে। কারাগারে এই সহিংসতা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে—এমনটাই মন্তব্য করেছেন নির্যাতনবিরোধী পাবলিক কমিটির নির্বাহী পরিচালক সারি বাশিই; তিনি অভিযোগ প্রত্যাহারের ঘটনাকে ‘‘ধর্ষণের অনুমতি দেওয়া’’ হিসেবে মর্মে কড়া প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন।
রিপোর্টের সমাপ্তিতে ক্রিস্টফ জরুরি এক প্রশ্ন তোলেন: আর্থিক ও সামরিকভাবে ইসরায়েলের পাশে থাকা যুক্তরাষ্ট্রেরও এসব অভিযোগ মোকাবিলার দায় রয়েছে। তাঁর কথায়, আমেরিকান করদাতার অর্থ ও সামরিক সহায়তা ইসরায়েলের নিরাপত্তা কাঠামোকে শক্তিশালী করছে—ফলে এই কাঠামোর সাথে যুক্ত যৌন সহিংসতার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ দায় যুক্তরাষ্ট্রকেও বহন করতে হতে পারে।
ক্রিস্টফের প্রতিবেদন, বিভিন্ন ক্ষতচিহ্নপ্রাপ্ত ব্যক্তির বর্ণনা ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর রিপোর্ট মিলিয়ে উঠে আসা চিত্রটি গুরুতর এবং তা দাবি-প্রত্যাখ্যানের মধ্যেই আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। ঘটনার বিবরণ অনুসন্ধান, স্বতন্ত্র তদন্ত ও দায়মুক্তি রোধ করা—এসব এখন আলোচ্য মূল প্রশ্ন।






