মধ্যপ্রাচ্য ও লোহিত সাগরের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার আঘাতে প্রাকৃতিক রাবারের দাম এখন নয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সিঙ্গাপুর এক্সচেঞ্জে প্রাকৃতিক রাবারের দাম বর্তমানে প্রতি কিলোগ্রামে ২.২২ ডলারে ওঠে গেছে, যা ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারির পর সর্বোচ্চ রেকর্ড। চলতি বছরের শুরু থেকেই রাবারের দাম already ২০ শতাংশের বেশি বাড়েছে।
বিশ্ববাজারে সরবরাহে বিলম্ব ও অনিশ্চয়তার আশঙ্কায় বড় বড় কোম্পানিগুলো আগে থেকেই ইনভেন্টরি বাড়াচ্ছে। থাইল্যান্ড ও মধ্যপ্রাচ্যের অবস্থা অনিশ্চিত হওয়ায় মারাত্মকভাবে সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ পড়ার ভয় দেখা দিয়েছে, ফলত আন্তর্জাতিক দর বাড়ার গতিকে ত্বরান্বিত করেছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে এবং তেলের দাম চড়ার ফলে কৃত্রিম রাবার উৎপাদন—যার উপাদান মূলত খনিজ তেল—অর্থনৈতিকভাবে কম লাভজনক হয়ে উঠছে। তাই টায়ারসহ বিভিন্ন শিল্প এখন বিকল্প হিসেবে বেশি পরিমাণে প্রাকৃতিক রাবারের দিকে ঝুকছে। থাইল্যান্ডের শীর্ষ রাবার উৎপাদক প্রতিষ্ঠান শ্রী ট্রাং এগ্রো-ইন্ডাস্ট্রির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, টায়ার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণ মজুতের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি কাঁচামাল স্টক করতে চাইছে।
তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে ল্যাটেক্স বা প্রাকৃতিক রাবারের চাহিদি বেড়ে যাওয়ার এই প্রবণতা থাইল্যান্ডসহ এশিয়ার অন্যান্য রাবার-বিশিষ্ট দেশগুলোর জন্য বড় বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি করেছে। এশিয়ার দেশগুলোই বিশ্ব প্রাকৃতিক রাবার উৎপাদনের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে — থাইল্যান্ড একাই মোট উৎপাদনের প্রায় ৩৪ শতাংশ সরবরাহ করে। এর পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম ও আইভরি কোস্টও উল্লেখযোগ্য উৎপাদক।
চীন বর্তমানে বিশ্ব রাবারের প্রায় ৪৫ শতাংশ ব্যবহার করে। বিশেষত চীনে বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) উৎপাদন দ্রুত বাড়ায় রাবারের চাহিদাও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের বিবেচনায় ইভিগুলো সাধারণ জ্বালানিচালিত গাড়ির তুলনায় ভারী হওয়ায় এবং ব্যাটারির ওজন ও দ্রুততর প্রতিক্রিয়া সামলাতে টায়ারে উচ্চমানের প্রাকৃতিক রাবারের প্রয়োজন বেশি হয়।
রাবারের দাম বৃদ্ধির প্রভাব কনজিউমারের কাঁধে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা আছে। জাপান ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার টায়ার নির্মাতারা ইতিমধ্যে সতর্ক করে জানিয়েছেন—কাঁচামালের দাম ও জাহাজ ভাড়ার বৃদ্ধির কারণে টায়ারের দর বাড়াতে হতে পারে। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করেন, যদি মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং জ্বালানি-দর উঁচু থাকে, তবে রাবারের ঊর্ধ্বগতিটি কয়েক মাস পর্যন্ত স্থায়ী থাকতে পারে।
তবে এই পরিস্থিতি রাবার উৎপাদনকারী দেশগুলোর জন্য অর্থনীতিতে নতুন প্রবৃদ্ধি আনার সুযোগও হিসেবে দেখা যাচ্ছে। রাবারের তুলনায় চাহিদা বেড়েছে বলে রপ্তানি থেকে রাজস্ব ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, সরবরাহশৃঙ্খল শোবল রাখা এবং মূল্য ওঠানামার সময় বাজার স্থিতিশীল রাখাই বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ দুটোই।






