ঈদুল আজহা উপলক্ষে ঘরমুখী মানুষদের চিরচেনা স্রোত শুরু হয়েছে। তবে আসল চাপে এবং সবচেয়ে বড় চাপটি শুরু হবে সোমবার (২৫ মে) থেকে বুধবার পর্যন্ত—অর্থাৎ এই তিন দিন। এবারে এক কোটি বেশি কর্মজীবী মানুষ ঢাকা ছাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে, যার মাঝে প্রতিদিন ঢাকা ছাড়বে প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ। এই আনন্দময় যাত্রা নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ রাখতে সরকার বিভিন্ন সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সড়ক, রেল ও নৌপথে বহুমুখী সুরক্ষা ব্যবস্থা। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ ২৪ ঘণ্টা চালু রাখা, ৬৬টি কুইক রেসপন্স টিম গঠন, এবং ঈদের আগে-পরে নৌযানে মালামাল পরিবহন নিষিদ্ধের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া মহাসড়কগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন, পশুবাহী ট্রাক নিয়ন্ত্রণ এবং ভাড়া ও চাঁদাবাজি রোধে নজরদারি করা হচ্ছে। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে, পরিবহন মালিক, শ্রমিক ও যাত্রীদের জন্য ঢাকায় ঢোকার বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যেখানে বলা হয়, বাস নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী নির্দিষ্ট টার্মিনাল থেকে ছাড়বে। যাত্রীরা নির্ধারিত ভাড়ার বেশি অর্থ আদায় করতে পারবেন না এবং যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার বা হয়রানি চলবে না। একই বাসে একাধিক যাত্রী বা অতিরিক্ত যাত্রী বহন, বাসের ছাদে যাত্রা, পণ্য বা পশুবাহী যানবাহনে যাত্রী নেওয়া নিষেধ। চালকদের জন্য অবশ্যই গতি সীমা মানা, বেপরোয়া বা অতিরিক্ত গতিতে চালানো থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। এমনকি ওভারটেকিং এবং বিপজ্জনক রাস্তা যেমন বাঁক ও সরু সেতুতে ওভারটেকিং থেকে বিরত থাকতে হবে। নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন, অস্বাস্থ্যকর অবস্থা বা ঘুমঘুম ভাবের মধ্যে গাড়ি চালানো সম্পূর্ণ নিষেধ। এছাড়া, চালকরা একটানা ৫ ঘণ্টা ও দিনে ৮ ঘণ্টার বেশি গাড়ি চালাতে পারবেন না। বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়া গাড়ি চালানো যাবে না, ড্রাইভিং লাইসেন্সের বৈধতা নিশ্চিত করতে হবে, মোবাইল ফোন বা ইয়ারফোন ব্যবহার, উচ্চস্বরে গান বাজানোও মানা হয়েছে। উল্টো পথে গাড়ি চালানোও নিষেধ। সড়ক পথে দাঁড়ানো বা চলন্ত অবস্থায় বাসে ওঠা-নামা ও পণ্যবাহী বা পশুবাহী যান ও যাত্রী পরিবহণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। অপরিচিত কারো খাবার বা পানীয় গ্রহণ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। জরুরী পরিস্থিতিতে টার্মিনাল পুলিশ কন্ট্রোল রুম বা জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ যোগাযোগের আহ্বান জানানো হচ্ছে। আশপাশের পরিস্থিতি উন্নত করতে ঢাকা ও অন্যান্য সড়কগুলোতে সতর্কতা ও নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করা হয়েছে। উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার সিরাজগঞ্জের মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বেড়েছে, তবে যানজটের সৃষ্টি হয়নি, বরং ফাঁকা সড়কে ভোগান্তি ছাড়াই মানুষ বাসায় ফিরছেন। হাটিকুমরুল গোলচত্বরের বাসচালক সাইদুল ইসলাম বলেন, এই মহাসড়কে যানজট নেই, নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যান চলাচল স্বাভাবিক। তবে দক্ষিণাঞ্চলের পরিস্থিতি ভিন্ন, সেখানে মহাসড়কে বাড়তে থাকা যানবাহনের চাপ ও দুর্ঘটনা উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। গত শুক্রবার এক ট্রাকের ধাক্কায় একজন যুবক নিহত হন। এক মাসের মধ্যে এই সড়কে দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ৬১। পদ্মা সেতু চালুর পর থেকে যানবাহনের চাপ অনেক বেড়ে গেছে, তবে মহাসড়কের ব্রিজ ও বাঁকগুলো বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। মহাসড়কের প্রশস্ততার অভাব এবং বিপজ্জনক বাঁকগুলো দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে। রাজধানীসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কটি এখনচরম ঝুঁকিপূর্ণ। বরিশাল অঞ্চলে একসময় প্রধান ভরসা ছিল নৌপথ, যেখানে সরাসরি ঢাকায় যেত উচ্চমাত্রায় লঞ্চ সার্ভিস। তবে পদ্মা সেতু চালুর পরে সময় অনেক কমে এসেছে—৮ থেকে ১০ ঘণ্টার এই যাত্রা এখন মাত্র ৩-৪ ঘণ্টায়। ফলে সরাসরি সড়কপথে যাতায়াতের চাহিদা বেড়ে যাচ্ছে। রোড সেফটি মুভমেন্টের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দৈনিক প্রায় দুই লাখ পঁইশো হাজার মানুষ ঢাকা-বরিশাল-কোয়াকাটা মহাসড়কে যাতায়াত করে, যা আগের তুলনায় প্রায় দেড়শ গুণ বেশি। এর ফলে পণ্য পরিবহণও বেড়েছে চোখে পড়ার মতোভাবে। মহাসড়কের প্রশস্ততার অভাব থাকায় পরিস্থিতি আজও ঝুঁকিপূর্ণ। ঢাকা থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত ৬ লেনের এক্সপ্রেসওয়ে থাকলেও বেশির ভাগ রাস্তা এখনো আগের প্রস্থে আছে। কোথাও বা ১৮ বা ২৪ ফুটের বেশি প্রশস্ত নয়। ফলে কিছু স্থানে দুটি বাস পাশাপাশি অতিক্রমও বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বরিশাল বাস মালিক গ্রুপের সভাপতি মোশাররফ হোসেন বলেন, ৬ লেন না থাকলে এই মহাসড়কে গতি বাড়ানো ও দুর্ঘটনা কমানো বেশ কঠিন। সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রকৌশলী মাসুদুর রহমান জানান, ফরিদপুর থেকে বরিশাল ও কুয়াকাটা পর্যন্ত ২৩২ কিলোเมตร দীর্ঘ এই মহাসড়কটি ৬ লেনে উন্নীতকরণের কাজ চলছে। জমি অধিগ্রহণের কাজ অনেক আগেই সম্পন্ন হয়েছে, এখন মূল কাজ শুরু হওয়ার অপেক্ষায়। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এই প্রকল্পের জন্য প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার অর্থানুকূল্য প্রাথমিকভাবে প্রস্তাব করেছে। এর ফলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড আরও জোরালো হবে। ইতোমধ্যে প্রশাসনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। বিআরটিএ ও ট্রাফিক পুলিশ বিভিন্ন নামে এসব দায়িত্ব পালন করছে। অতিরিক্ত ৬৫০ পুলিশ সদস্য মোতায়েন রয়েছে, যারা যানজট নিয়ন্ত্রণ ও ট্রাফিক নিয়ম মানীন নিশ্চিত করবে। বিজিবি আরও ৭ দিন আগে থেকে ও ঈদের পর পর্যন্ত প্রশাসনের সহায়তায় মোতায়েন রয়েছে। ডিজিটাল টোল ব্যবস্থা চালু হয়েছে, যাতে সেতু ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সড়কে মোবাইল ভিসা ও মাস্টারকার্ডের মাধ্যমে ‘কন্ট্যাক্টলেস’ পেমেন্ট করতে সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। সব মিলিয়ে, সরকার ও প্রশাসন ঈদযাত্রার জন্য ঢাকা ও অন্যান্য রাস্তায় যথেষ্ট প্রস্তুতি গ্রহণ করছে, যেন এই মহামারি সময়টিতে সব রকম চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সাধারণ মানুষের নিরাপদ যাত্রা সম্ভব হয়।






