ক্যালেন্ডারের পাতায় বর্ষা এখনও কিছুদিন বাকি, তবু খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলা জুড়ে মনে হচ্ছিতো বর্ষা এসেছে। জ্যৈষ্ঠের তপ্ত রোদ ঝলসানো রেখে হঠাৎ মেঘের আগমন আর হালকা বৃষ্টির ছোঁয়ায় গ্রামের আঙিনায়, পুকুরপাড়ে ও সড়ক ধারে ‘বর্ষার দূত’ কদম ফুল দেখা গেছে।
সবুজ পাতার আড়ালে গোলকাকৃতি এই ফুলগুলো অসাধারণ সৌন্দর্য ও মিষ্টি সুবাস ছড়ায়; পথচারি থেমে দেখে, শিশুসন্তানেরা খেলায় ঝাঁপিয়ে পড়ে, তরুণীরা একে-অপরকে কদম ফুল উপহার দিয়ে আগাম বর্ষাকে স্বাগত জানাচ্ছে। কিন্তু এই মনোরম দৃশ্যের পিছনে এক গভীর উদ্বেগও আছে — স্থানীয় প্রকৃতিবিদ ও আবেগী বয়োবৃদ্ধরা বলছেন, কদম এখন দ্রুত বিরল হয়ে পড়ছে।
উপজেলার খর্ণিয়া, চন্ডীপুর, শোভনা ও ভদ্রা নদীর তীরবর্তী কয়েকটি গ্রামে ঘুরে দেখা গেছে বাড়ির আঙিনা, পুকুরপাড় কিংবা রাস্তার ধারে কেবল দু-একটিমাত্র গাছে কচকচে ধাপে কদম ফোটা। এক দশক আগে যেখানে মোড়ে মোড়ে, খামারে ও ঝোপঝাড়ে কদমের ঘন বন ছিল, এখন সেসব স্থান শূন্য হয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের কথায়, নির্বিচারে গাছ কাটা ও নতুন করে চারা রোপণ না করা প্রধান কারণ। কদম গাছের কাঠের বাজারমূল্য কম হওয়ায় মানুষ বাড়ি নির্মাণ বা বাণিজ্যের জন্য লাগাতে আগ্রহী নয়; বরং কখনো কখনো স্থানীয় ইটভাটা কিংবা ফ্যাক্টরির জ্বালানির জন্যও কেটে ফেলা হয়। সরকারি বা বেসরকারি বনায়ন কর্মসূচিতেও কদমের চারা বিতরণে বড় ধরনের উদ্যোগ দেখা যায় না — ফলে পুরনো কুসুমধারা লোপ পাচ্ছে।
ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাজমুল হুদা বলেন, ‘কদম শুধু সুগন্ধি বা সৌন্দর্যের প্রতীক নয়; এটি আমাদের দেশীয় জীববৈচিত্র্যের অংশ। পরাগায়নে সহায়ক পতঙ্গ ও পাখিদের আশ্রয় ও খাদ্যের উৎস হিসেবে এর গুরুত্ব অপরিসীম। বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ বাদ দিয়ে পারিবারিক ও ফসলি জমির আইলে কদমের মতো দেশীয় গাছ রোপণ করা উচিত। আমরা কৃষকদের মাঝে এই বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর কাজ শুরু করব।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিস সবিতা সরকার বলেন, ‘কদম ফুল আমাদের আদি বাংলার সংস্কৃতির অংশ। গ্রামীণ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এগুলো থাকবে — সেটাই আমাদের লক্ষ্য। সরকারি বনায়ন কর্মসূচির সঙ্গে মিলিয়ে আমরা স্থানীয়ভাবে ফলদ ও বনজ গাছের সাথে কদমের চারা রোপণে মানুষকে উৎসাহিত করব।’
ডুমুরিয়ার সচেতন মহল বলছে, কদম টিকিয়ে রাখতে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে — রাস্তার ধারে, বাড়ির পতিত জমি ও খামারের মুকুটে অন্তত এক বা দুটো কদমের চারা লাগানো হোক। তারা আশা করছেন বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসন যৌথভাবে একটি কার্যকর এবং ধারাবাহিক উদ্যোগ নেবে, যাতে ‘বর্ষার দূত’ কদম আবারও ডুমুরিয়া জুড়ে উঠতে পারে।






