পদ্মার ভাঙাচোরা বালুচর যে একসময় নিঝুম ও নীরব অবস্থায় পড়ে থাকত, তা আজ দেশের নবায়নযোগ্য শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। পাবনার দুইটি সৌর পার্ক থেকে মোট ১৬৪ দশমিক ৫৫ মেগাওয়াট পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হচ্ছে—এতে গ্রামীণ অর্থনীতি, অবকাঠামো ও স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি এই প্রকল্পগুলো স্থানীয় কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়ানোর ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
পাবনা সদর ও সুজানগর উপজেলায় পদ্মার তীরবর্তী দুটি বড় সৌর কেন্দ্র কার্যক্রম শুরু করেছে। পাবনা সদরের হেমায়েতপুর ইউনিয়নের চর ভবানীপুরে ডায়নামিক সান এনার্জি প্রাইভেট লিমিটেড নির্মিত সৌর পার্কটির উৎপাদন ক্ষমতা ১০০ মেগাওয়াট (এসি)। প্রায় ৪০০ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই কেন্দ্রটিতে আছে ২ লাখ ৭৪ হাজারের বেশি সৌর মডিউল এবং ৭৬০টি আধুনিক ইনভার্টার। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) ১২১ দশমিক ৫৫ মিলিয়ন ডলার অর্থায়নে নির্মিত এই কেন্দ্রটি পরীক্ষামূলক পর্ব শেষে ২৩ অক্টোবর ২০২৪ থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে এবং বর্তমানে প্রতিদিন ধারাবাহিকভাবে ১০০ মেগাওয়াট সবুজ বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করছে।
এই প্ল্যান্টটির পরিচালনা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি প্রতি বছরে প্রায় ১৯৩ দশমিক ৫ গিগাওয়াট-ঘণ্টা (GWh) সুচল বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রাখে, যা বছরে আনুমানিক ৯৩,৬৫৪ টন কার্বনডাইঅক্সাইড নির্গমন কমাতে সহায়তা করবে—এটি বাংলাদেশের জলবায়ু লক্ষ্য অর্জনে এক বড় মাইলফলক বলে বিবেচিত।
সুজনগর উপজেলার সাগরকান্দি চরে বাংলাদেশ-চায়না যৌথ উদ্যোগে গড়া আরেকটি সৌর কেন্দ্র জাতীয় গ্রিডে ৬৪ দশমিক ৫৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ করছে। প্রায় ২০৫ একর জমিতে নির্মিত এই পার্কটিতে আছে ১ লাখ ৪৭ হাজার সৌর মডিউল ও ১১টি ইনভার্টার। বাংলাদেশ-চায়না রিনিউঅ্যাবল এনার্জি কোম্পানি লিমিটেডের উদ্যোগে এই কেন্দ্রটি ২৬ আগস্ট ২০২৫ থেকে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করে।
দেশের নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড (এনডব্লিইপিজিসিএল) এবং চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইম্পোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন (সিএমসি) সমান অংশীদারিত্বে গঠিত এই কোম্পানি ২০২০ সাল থেকে সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে; এরই ধারাবাহিকতায় সিরাজগঞ্জে ৬৮ মেগাওয়াট প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
দুইটি সোলার পার্ক চালু হওয়ার পরে চরাঞ্চলের চিত্রই বদলে গেছে। যেখানে আগে সন্ধ্যার পর জীবনে থকমে যেত, কাঁচা রাস্তা ছাড়া চলাচলের উপায় ছিল না—আজ সেখানে পাকা রাস্তা, কংক্রিটের বাড়ি ও স্থায়ী দোকানপাট গড়ে উঠেছে; দিনরাত বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড সচল। সোলার পার্ক নির্মাণের কারণে স্থানীয় জমির দামও কয়েক গুণ বেড়ে গেছে—স্থানীয়রা জানান, কয়েক বছর আগে যেখানে বিঘা প্রতি প্রায় ২–৩ লাখ টাকায় জমি বিক্রি হতো, আজ তা হয়েছে ৭–৮ লাখ এবং কিছু ক্ষেত্রে ১২ লাখ টাকারও বেশি।
তবে ইতিবাচক প্রভাবের সঙ্গে কিছু উদ্বেগও দেখা দিয়েছে। সৌর প্রকল্পের কারণে উপজেয় কৃষিজমির পরিমাণ কমে যাওয়ায় বহু কৃষক বাধ্য হয়ে নিজের জমি হারিয়েছেন। স্থানীয় কৃষক মাসুদ মোল্লা বলেন, “আমাকে সাত বিঘার মধ্যে পাঁচ বিঘা ছাড়তে হয়েছে। জমির ক্ষতিপূরণ পেয়েছি, সেই টাকা দিয়ে ছেলেদের জন্য দোকান করেছি; তবু কৃষি ত্যাগ করার পর নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলেছি।” অপর প্রবীণ বাসিন্দা বারেক শেখ জানান, তার চার বিঘা জমি অধিগ্রহণ হয়েছে এবং গ্রামে শত শত কৃষকের জমি প্রকল্পে ব্যবহৃত হওয়ার ফলে আবাদি জমি কমে গেছে।
সাগরকান্দির কয়েক দফা পরিবারের পরিস্থিতি আরও জটিল—অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে চাষাবাদ করলেও এখনো ক্ষতিপূরণ পাননি। প্রকল্প কর্তৃপক্ষ বলেছে, জমির বৈধ কাগজপত্র না থাকলে ক্ষতিপূরণ দেওয়া যায় না; কিছু ক্ষেত্রেই সৌর প্রকল্প সরকারি মালিকানাধীন জমির ওপর নির্মাণ করা হয়েছে বলেও তারা জানিয়েছেন।
সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে দেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ৪০ শতাংশ নবায়নযোগ্য ও পরিচ্ছন্ন উৎস থেকে পূরণ করার লক্ষ্যমাত্রা রেখে দিয়েছে। পাবনার এই দুটি সোলার পার্ক সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে ও চলমান বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। তবু স্থানীয় উন্নয়ন ও বৈশ্বিক জলবায়ু লক্ষ্য দুটোই নিশ্চিত করতে হলে জমি ব্যবহার, ক্ষতিপূরণ ও সামাজিক প্রতিকূলতার মোকাবেলায় সুসংগঠিত নীতি ও স্থানীয়দের অংশগ্রহণ জরুরি।






