বৈশ্বিক অস্থিরতা ও নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে দেশি অর্থনীতি পুরোপুরি দ্রুতগতিতে ফিরতে পারেনি। ক্ষতিগ্রস্ত এবং আংশিকভাবে বন্ধ থাকা শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত সচল করা এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতেই সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক একাধিক উদ্যোগ নিচ্ছে।
সরকার শিগগিরই দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে রোডশো আয়োজন করবে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ৪ জুন অনুষ্ঠিত এক সভায় বন্ধ বা অলাভজনক কারখানা চালু রাখা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় কারখানাগুলোর বর্তমান অবস্থা, প্রধান সমস্যা ও সম্ভাবনা আলোচনা করে দ্রুত কার্যকরী পরিকল্পনা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট সূত্রদের দ্রুত এসব কারখানা পুনরায় চালু করে অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোর লাভজনকতা বাড়ানোর কার্যকর পথ খুঁজে বের করতে বলেছেন এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্বারোপ করেছেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত ২৩ মে অর্থনীতিতে গতি ফিরিয়ে আনা এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল ঘোষণা করেছে এবং ‘বন্ধ শিল্প ও সেবা খাত-সহায়ক প্রাক্-অর্থায়ন স্কিম’ নামে নীতিমালা জারি করেছে।
নীতিমালার মূল দিকগুলো হলো:
– একক প্রতিষ্ঠান বা গ্রুপ সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবে।
– গ্রাহক পর্যায়ে সুদের হার সর্বোচ্চ ৭% নির্ধারণ করা হয়েছে; ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের তহবিল থেকে ৪% সুদে অর্থ গ্রহণ করে ঋণ দেবে।
– তহবিলের উদ্দেশ্য প্রধানত কার্যকরী মূলধন যোগানো; শ্রমিক-কর্মচারীদের সর্বোচ্চ চার মাসের বেতন-ভাতা, বিদ্যুৎ-গ্যাস ও অন্যান্য ইউটিলিটি বিল, এবং উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ক্রয়েই অর্থ ব্যয় করা যাবে।
– এই অর্থ পুরনো ঋণ পরিশোধ বা সমন্বয়ে ব্যবহার করা যাবে না এবং শ্রমিকদের বেতন সরাসরি ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রদেয় হবে; নগদ লেনদেন অনুমোদিত নয়।
– ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ এক বছর; প্রয়োজন অনুযায়ী নবায়নের সুযোগ থাকবে এবং প্রথম ছয় মাস গ্রেস পিরিয়ড থাকবে, অর্থাৎ ছয় মাস পর সুদের কিস্তি পরিশোধ শুরু করতে হবে।
– রপ্তানিমুখী ও ‘প্রচ্ছন্ন’ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। কোনো দক্ষ প্রতিষ্ঠান যদি বন্ধ কারখানা অধিগ্রহণ বা ইজারা নিয়ে পুনরায় চালু করে, তাদেরও এই সুবিধা দেয়া হবে।
– ঋণগ্রহীতার বিরুদ্ধে আগে থেকে ঋণখেলাপি, অর্থপাচার বা ঋণ অপব্যবহারের রেকর্ড থাকলে তারা তহবিলের আওতায় আসবে না।
তহবিলের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোকে নিয়মিত তদারকি করতে হবে; প্রতি তিন মাস অন্তর কারখানা পরিদর্শন করে প্রতিবেদনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও যে কোনো সময়ে সরেজমিনে পরিদর্শন করতে পারবে। নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের হিসাব থেকে কাটা নেওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত ২% দণ্ড সুদ আরোপ করা হবে।
অর্থনীতিবিদ ও উদ্যোক্তাদের মত অনুযায়ী, ২০ হাজার কোটি টাকার এই তহবিল যদি স্বচ্ছ ও সুচারুভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে তা দেশি রপ্তানিমুখী শিল্পের তরলতা ফিরিয়ে এনে একাধিক বন্ধ বা আংশিক বন্ধ কারখানা পুনর্ধারণে সাহায্য করতে পারে। ফলে লক্ষাধিক মানুষকে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং রপ্তানি আয়ের মাধ্যমে অর্থনীতিতে নতুন গতি আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তবু প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে যোগ্য প্রতিষ্ঠান নির্বাচন, ঋণবণ্টনে স্বচ্ছতা এবং বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতির উপরে।






