“ভাই, আমার সন্তানের জন্য একটু পানি দেন—টাকা দেব।” কাঁটাতারের শূন্যরেখায় দাঁড়িয়ে পঞ্চগড়ের হাড়িভাসা ইউনিয়নের বড়বাড়ি সীমান্তে এক বাবার এই আকুল আর্তনাদ শুধু সীমান্তরক্ষীদের নয়, দুই দেশের সীমান্ত লাগোয়া মানুষের বিবেককেও কাঁপিয়ে দিয়েছে। আইন ও কূটনীতির জটিলতায় সেই জনহৃদয় উষ্ণ করা আহ্বানকে কেউ তৎক্ষণাৎ মেনে নিতে পারেনি।
রাজনৈতিক সম্পর্ক যখন নতুন করে ইতিবাচক গতিতে ফেরার ইঙ্গিত দিচ্ছে, ঠিক তখনই দেশের বিভিন্ন সীমান্তে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) জোরপূর্বক ‘পুশ-ইন’ বা ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা তীব্রভাবে বাড়ছে। দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে উত্তর-পূর্ব—সবখানেই পুশ-ইন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পরিচয়হীনতার ভার নিয়ে শূন্যরেখায় খোলা আকাশের নিচে বহু মানুষ দিনাতিপাত করছেন; তীব্র দাবদাহে, বর্ষণে ছাতা-আশ্রয়বিহীন অবস্থায় নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা মানবেতর জীবনযাপন করছে। এ পরিস্থিতি শুধু একটি সীমান্ত সমস্যা নয়, এক গহ্বর মানবিক ও কূটনৈতিক সংকট হিসেবে মুখোশ খুলে দিয়েছে।
একই রাতে জামালপুর—কুড়িগ্রামে আটটি পৃথক পয়েন্টে একযোগে শতাধিক মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। বিজিবির দেয়া তথ্য অনুযায়ী ওই রাতের পয়েন্টভিত্তিক চিত্র ছিল এমন:
– খেয়ারচর বিওপি (পিলার ১০৬৯): ভারতীয় সদরটিলা এলাকা দিয়ে প্রায় ২৫–৩০ জনকে পুশ-ইনের চেষ্টা।
– পাথরেরচর বিওপি (পিলার ১০৭৫): লুকায়েরচর এলাকা দিয়ে ১৮–২০ জনকে ঠেলে আনার চেষ্টা।
– ইজলামারি বিওপি (পিলার ১০৬৭): মানকারচর এলাকা দিয়ে ১২–১৩ জন।
– মোল্লারচর সীমান্ত (পিলার ১০৬২): কুচুনিমারা এলাকা দিয়ে ১০–১২ জন।
– দাঁতভাঙা বিওপি (পিলার ১০৫৪): দীপচর এলাকা দিয়ে ৮–১০ জন।
– ঝাউডাঙা বিওপি (পিলার ১০৭৮): দুর্গাপাড়া এলাকা দিয়ে ৮–১০ জন।
– বাঘারচর বিওপি (পিলার ১০৭৩): বালুরঘাট ও কুমারেরচর এলাকা দিয়ে ৭–৮ জন।
– সাতানীপাড়া বিওপি (পিলার ১০৮৭): বিলডুবা এলাকা দিয়ে ৭–৮ জনকে পুশ-ইন করার চেষ্টা।
জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের কুমারেরচর এলাকায় মধ্যরাতে বিএসএফ আচমকাই সার্চলাইট ও সীমান্ত এলাকার আলো বন্ধ (লাইট-অফ) করে; এ আঁধারেই তারা পুশ-ইনের চেষ্টা চালায়। বিজিবি ও স্থানীয় লোকজনের স্থির প্রতিরোধ ও অতন্দ্র প্রহরায় সেই রাতের অভিযান ব্যর্থ হয়। এর আগের রোববার রাতেও বড়াইবাড়ি সীমান্ত দিয়ে ৮ জনকে ঠেলে আনার চেষ্টা নস্যাৎ করা হয়।
জামালপুর ব্যাটালিয়ন ৩৫ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসানুর রহমান বলেন, ‘সীমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। আমাদের আওতাধীন ৭২ কিলোমিটার সীমান্তে ১৫টি বিওপি দিনরাত টহল জোরদার করেছে। অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে গোয়েন্দা নজরদারি ও স্থানীয় পর্যবেক্ষণ বৃদ্ধি করা হয়েছে।’
বিএসএফের এই দফায় দফায় পুশ-ইন চেষ্টার বিরুদ্ধে স্থানীয় মানুষদেরও ক্ষোভ তীব্র। সীমান্ত রক্ষায় বিজিবির পাশে দাঁড়িয়ে জনপ্রতিনিধি, গণ্যমান্য ও গ্রামবাসী লাঠিসোতা নিয়ে রাতভর সীমান্ত পাহারায় ছিলেন। স্থানীয় বাসিন্দা জহুরুল হক বলেন, ‘কয়েকদিন ধরে ভারত থেকে আমাদের দেশে মানুষ ঢুকানোর চেষ্টা হচ্ছে। আমরা বিজিবির সঙ্গে আছি।’ আরেক গ্রামবাসী আমিনুর ইসলাম যোগ করেন, ‘গ্রামের সবাই রাতদিন সতর্ক। আমরা কোনওভাবেই ভারতের মানুষকে আমাদের দেশে ঢুকতে দেব না।’
অন্যদিকে পঞ্চগড়ের হাড়িভাসা ইউনিয়নের বড়বাড়ি সীমান্তে চিত্রটি মর্মান্তিক। সেখানে ৩৮ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে শূন্যরেখায় আটকা পড়ে আছে ১০ জন—নারী, পুরুষ ও শিশু; তাদের মধ্যে তিনটি শিশু মাত্র ৬–৯ বছরের। কয়েকদিনের বর্ষণে তারা ভেজা-চরম অসুবিধাজনক পরিস্থিতিতে আছেন; মাথার ওপরে কোনো ছাদ নেই, পায়ের নিচে কাদামাটি। বিশুদ্ধ পানির অভাবে শিশুরা বৃষ্টির পানি বা ডোবার নোংরা পানি খেতে বাধ্য হচ্ছে — স্বাস্থ্যঝুঁকি মারাত্মক। শিশুদের কাতর কাঁদন-চোখ কূটনীতি বা সীমান্ত আইনের কোনো ব্যাখ্যা বোঝে না; তাদের চাওয়া এক ফোঁটা পানি, সে চাওয়াটা পূরণ করার কেউ নেই।
নওগাঁ সীমান্তেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। এখানে সীমান্ত হত্যা, কৃষকদের ওপর বিএসএফের হয়রানি—এ সব নিয়ে বছরজুড়ে আলোচনা থাকে। নওগাঁজেলের সঙ্গে ভারতের নয়টি সীমান্ত রয়েছে; সাপাহার উপজেলার হাঁপানিয়া ও করমুডাঙ্গা, পোরশা উপজেলার নীতপুর এবং ধামইরহাট উপজেলার কালুপাড়া, চকিলাম, চকচণ্ডি, বস্তাবর, শিমুলতলী ও তালান্দা উল্লেখযোগ্য। সবচেয়ে বেশি হয়রানি ও সীমান্ত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে হাঁপানিয়া, করমুডাঙ্গা ও নীতপুরে।
কৃষির উপর নির্ভরশীল সীমান্তবাসীর জীবিকা সীমান্ত-সংঘাতে বারবার বিঘ্নিত হচ্ছে। করমুডাঙ্গার সুলতান বলেন, ‘জমিতে চাষাবাদ ছাড়া আমাদের কাজ নেই। মাঠে গেলে বিএসএফ প্রায়ই আমাদের ধাওয়া করে, ভয় দেখায়—তার পরও বেঁচে থাকতে কাজ করতে হয়।’ আক্কাস নামের আরেক গ্রামবাসী বলেন, ‘পুশ-ইন আতঙ্ক সবসময় আছে। বিজিবিও সতর্ক থাকলেও নিরাপত্তার বিষয়ে দুশ্চিন্তা থেকেই যায়।’
পোরশার নীতপুরে স্থানীয়রা সোমবার রাত ১০টার দিকে সীমান্তে বিএসএফের উপস্থিতি দেখতে পেয়ে প্রায় ২০০ জন লাঠি ও টর্চ নিয়ে রাত বাকী সময় পর্যন্ত পাহারা দিলেন। নওগাঁ-১৬ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম বলেন, ‘বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্কতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে—সার্বক্ষণিক নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো ও স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও জনগণের সঙ্গে সমন্বয় অব্যাহত থাকবে। মানবপাচার, অবৈধ অনুপ্রবেশ ও পুশ-ইন প্রতিরোধে আমরা দৃঢ়।’
এই বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কঠোর বার্তা দিয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, বাংলাদেশ এই অনাকাঙ্ক্ষিত পুশ-ইনের বিরুদ্ধে নীরব থাকবে না; ইতোমধ্যে দিল্লিতে ১২–১৩টি চিঠি পাঠানো হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, বিজিবি সজাগ রয়েছে এবং সম্প্রতি চেন্নাই থেকে ৩৪ জনকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে নাগরিক হস্তান্তরের যে মেকানিজম আছে, তা কূটনীতি অনুসরণ করে কার্যকর করার আহ্বান জানানো হয়েছে; অসতর্কতা অব্যাহত থাকলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগানো কঠিন হবে—এটিও হুঁশিয়ারি জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল দাবি করেছেন, তারা দ্বিপক্ষীয় চুক্তি এবং আইন অনুযায়ী অবৈধ নাগরিকদের ফেরত পাঠাচ্ছে; বাংলাদেশের কাছে একটি তালিকা দেওয়া হয়েছে এবং পরিচয় শনাক্ত দ্রুত করার অনুরোধ এসেছে। ভারতের পক্ষ দাবি করে যে পশ্চিমবঙ্গের হাকিমপুর সীমান্তে প্রতিদিন গড়ে শতাধিক মানুষ বাংলাদেশে ফেরার আশায় জড়ো হচ্ছেন এবং ঢাকা-দিল্লির সম্মতিতে ধাপে ধাপে হস্তান্তর সম্পন্ন হবে।
বিশেষজ্ঞদের দেখা সেই যে, এই পুশ-ইন কোনো সাধারণ সীমান্ত ব্যবস্থাপনার সমস্যা নয়। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইশফাক ইলাহী চৌধুরীর মনে হচ্ছে—এটি কৌশলগত ও রাজনৈতিক বার্তার অংশ; রাতভর মানুষ ঠেলে দেওয়া আন্তর্জাতিক রীতিরও বিরুদ্ধ। এক্স-কূটনীতিক অনির্বাচিতভাবে সতর্ক করে দিয়েছেন—ভারত যদি দ্বিপক্ষীয় কূটনীতির বাইরে গিয়ে এমন একতরফা পুশ-ইন বজায় রাখে, তাহলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক কাঠামোর আশ্রয় বা প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে জাতিসংঘের মানবাধিকার/শরণার্থী সংস্থার সহযোগিতা খুঁজতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও নাগরিক পরিচয় যাচাই নিয়ে অনড় অবস্থান এই সীমান্ত সংকটকে আরও জ্বালানি যোগাচ্ছে।
কাঁটাতারের ঐ সীমান্ত রেখা শুধু লোহা ও বিজড়িত তার নয়—তার ওপরে মানুষের জীবন, ভ্যানারি ও কণ্ঠ আটকে আছে। কূটনীতি ও আইনী তর্ক-বিতর্ক চলুক, কিন্তু একফোঁটা পানি চাইতে গিয়ে যখন শিশুরা কাঁদে, তখন মানবিকতার দায় কারও খাতা থেকে মুছে ফেলা যায় না।
প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন—যশোর, জামালপুর, কুড়িগ্রাম, গঞ্চগড় ও নওগাঁর প্রতিনিধি।






