অবশেষে দীর্ঘ এক দশকের স্থবিরতা কাটিয়ে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় প্রস্তাবিত চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল প্রকল্পের কাজের নতুন দিগন্ত সূচিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরের ঠিক আগে এই এলাকার জন্য ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। এসময় সরকারি অর্থে বিলাসবহুল গাড়ি কেনার প্রস্তাব বাতিল করে, মিতব্যয়িতা ও অর্থনৈতিক সাশ্রয়ে সরকারের দৃঢ় প্রতিশ্রুতির প্রকাশ ঘটেছে। মঙ্গলবার (১৬ জুন) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় মোট ৭ হাজার ৩ কোটি টাকার পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়।
প্রকল্পের ইতিহাসে খানিকটা দুর্বোধ্য সময় কাটিয়ে, ২০১৬ সালে চীন-ঢাকা দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার মাধ্যমে আনোয়ারার এই অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে ভূমি অধিগ্রহণ এবং চুক্তি জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন প্রকল্পে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। মহাজোটের বর্তমান সরকার গত সালে এই জটিলতা কাটিয়ে চীনের অবকাঠামো নির্মাণ প্রতিষ্ঠান সিআরবিসির সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্নের পথে এগোচ্ছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) জানিয়েছে, কাজের অগ্রগতি দৃঢ়, এবং এখন চুক্তিপত্র চূড়ান্তকরণের পথে।
অবকাঠামো উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ধাপ হিসেবে এই প্রকল্পের আওতায় সুন্দর যোগাযোগ ব্যবস্থা, পরিবেশ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বন্দর ও জ্বালানি সুবিধা জোরদার করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে ১২৩৫ মিটার দীর্ঘ জেটি লিঙ্ক রাস্তা, একটি ৩৩০ মিটার দীর্ঘ সেতু, ২৫ মিলিয়ন লিটার ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন বর্জ্য শোধন কেন্দ্র, ২০ হাজার ডেডওয়েট টন ক্ষমতাসম্পন্ন জেটি, গ্যাস সরবরাহ লাইন, বিদ্যুৎ ও পানি নির্মাণ। কানারফুলী টানেল, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দরের কাছাকাছি হওয়ায় এই অঞ্চলের ভৌগোলিক গুরুত্ব অনন্য।
সরকারের আশা, এই প্রকল্প ভবিষ্যতে চীনা বিনিয়োগের জন্য একটি কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে, যেখানে বস্ত্র, ওষুধ ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে প্রায় ৫০ কোটি ডলার বিদেশি বিনিয়োগ সক্ষম হবে। এছাড়াও, সরাসরি ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে প্রায় ১ লাখ মানুষের। এই প্রকল্পের জন্য মোট ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকার মধ্যে, বাংলাদেশ নিজস্ব তহবিল থেকে ১,৭২২ কোটি টাকা এবং চীনা সরকারের থেকে ২,৪৬৭ কোটি টাকা বিনিয়োগ হিসেবে আসবে। ঋণের সুদহার ২ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে থাকছে, যা আন্তর্জাতিক মান অনুসারে সহজ ও স্বাভাবিক।
সাম্প্রতিক একনেক সভায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্যয় সংক্রান্ত কিছু ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নেন। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ১৫৪২ কোটি টাকার প্রকল্পে একটি জিপ গাড়ি কেনার প্রস্তাব উঠলে তিনি তা অবিলম্বে বাতিলের নির্দেশ দেন, যাতে সরকারের মিতব্যয়িতার দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাদের অনুরোধ করলেও, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিমের বিরোধিতা এবং প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশের ফলে গাড়ি কেনার প্রস্তাব পুরোপুরি বাতিল হয়।
অতিরিক্তভাবে, একনেক এই সভায় কয়েকটি অন্যান্য প্রকল্পের অনুমোদন দেয়, যার মধ্যে রয়েছে পানিসম্পদ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চারটি প্রকল্প। মোট ৭০৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয়ে, যার মধ্যে সরকারি তহবিল ৪৫৩ কোটি আর বিদেশি ঋণ ২৪৬ কোটি। এর মধ্যে রয়েছে: মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ প্রকল্প, করতোয়া নদী উন্নয়ন, পদ্মা ভাঙন রক্ষা, এবং দেশের বিভিন্ন উপজেলায় নতুন কারিগরি স্কুল ও কলেজ নির্মাণ। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের জলবায়ু ও শিক্ষা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হবে।
বিশ্লেষণে, চলতি মাসের শেষের দিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর খুবই গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও বাণিজ্য উন্নয়নের জন্য। দেখা যাচ্ছে, এই প্রকল্পের দ্রুত অগ্রগতি কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করবে। সভায় উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রীসহ বিভিন্ন উচ্চ পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।






