মধ্যপ্রাচ্য বললেই চোখের সামনে 떠오য় সম্ভাব্য যুদ্ধ, অমনিকযতা ও ভাঙাচোরা শান্তির ছবি। কিন্তু এই অশান্তির মূল ভূমিকায় শুধু স্থানীয় জনগণ না—অনেকটাই ইতিহাসের ভুল সিদ্ধান্ত এবং পরাশক্তির ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ। গত একশো বছরে এই অঞ্চলে শান্তি ফেরানোর নামে যত বড় চুক্তি হয়েছে, অনেকে অবলম্বন করেছে নতুন সংঘাতের বীজ। যা দেখা হত শান্তির উদ্যোগ—তার অনেকটাই হয়ে উঠেছে বিভাগভিত্তিক রাজনীতির হাতিয়ার।
এই ধারাবাহিকতার মধ্যেই ২০২৬ সালের জুনে বিশ্ব আবার এক নাটকীয় মোড়ের সম্মুখীন হয়েছে। সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টকে শুক্রবার (১৯ জুন) অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকা বহুল প্রতীক্ষিত যুক্তরাষ্ট্র–ইরান শান্তি আলোচনা শেষ মুহূর্তে স্থগিত হয়। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের সফর বাতিলের পর ওই বৈঠক পিছিয়ে যাওয়ায় অঞ্চলটিতে শান্তির সম্ভাবনা এখন গভীর অনিশ্চিততার মুখে পড়েছে। চার মাসের রক্তক্ষয়ের পর এই ‘শান্তি চুক্তির ভবিষ্যৎ’ কী হবে—তার উত্তর নেই। একই সময়ে ইসরায়েলের তীব্র ভাষ্য এবং লেবানন জুড়ে ক্রমবর্ধমান হামলা—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য আবার এক নতুন বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
সংকটপূর্ণ দিনগুলোরই এক ক্ষতিহীন ছবি—শুক্রবার লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় এনএনএর বরাতে অন্তত ১৮ জন নিহত হন; আরও অনেকে আহত ও নিখোঁজ। ওই ওই অঞ্চলটিতে একাধিক আবাসিক ভবন লক্ষ্য করে চালানো এই হামলাগুলিকে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘সবচেয়ে তীব্র’ বলেছে। চলমান উত্তেজনার পটভূমিতে, অন্যান্য কিছুও থেমে নেই—গত অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পর গাজায় ইসরায়েলি আক্রমণ বন্ধ হয়নি; নিহতের সংখ্যা তখনও হাজার ছাড়িয়েছে। মেডিকেল এইড ফর প্যালেস্টাইনসের গাজা পরিচালক ফিকর শালতুত জানিয়েছেন, অনেকের বিশ্বাস ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ পর্যায় শেষ, কিন্তু বহু পরিবার এখনও তাদের প্রিয়জনকে দাফন করছে।
চুক্তির প্রতিশ্রুতির মেয়াদ ও বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন সমানভাবে তীব্র। গত অক্টোবরে সই হওয়া ‘যুদ্ধবিরতি’ বড় ধরনের সম্মুখযুদ্ধ বন্ধ করলেও দ্বিতীয় পর্যায়—ইসরায়েলি সৈন্যদের গাজা থেকে প্রত্যাহার ও হামাসের অস্ত্রসমর্পণ—বাস্তবায়িত হয়নি। কার্যত চুক্তির কাগজে থাকা অধিকাংশ শর্ত মঞ্চেই আটকে আছে। অক্টোবরের পর ইসরায়েলের উপস্থিতি আরও জোরালো হয়ে উঠেছে; যেখানে চুক্তি অনুযায়ী গাজার ৫৩ শতাংশ এলাকায় ইসরায়েল নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে বলা হলেও আজ তারা প্রায় ৬৪ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণে রেখেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
জাতিসংঘের মানবিক সমন্বয়কারী অফিস (ওসিএইচএ) জানিয়েছে, পূর্ব গাজা শহরের ডজনখানেক পরিবারকে তুলে নেওয়া হয়েছে—কারণ সেখানে ইসরায়েলি বাহিনী হলুদ সিমেন্ট ব্লক বসিয়েছে, যা ‘ইয়েলো লাইন’ পশ্চিম দিকে বাড়ানোর ইঙ্গিত দেয়। আর লেবাননে, অনেকে ইতিমধ্যেই বাড়ি হারিয়েছেন; এক লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত—অবস্থাটা বাড়ছেই।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির জটিলতা বেড়েই চলেছে। একদিকে, সংস্থাপিত সূত্র বলছে ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে যুদ্ধবিরতির শর্তে সম্মতি হয়েছে; যুক্তরাষ্ট্র ও কাতার মধ্যস্থতা করেছে এবং ইরানও এতে ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে, ইসরায়েল এসব কূটকর্মের বাইরে দাঁড়িয়ে আরও সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে—লেবাননে তাদের বিমান হামলা ও স্থল অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একই সময়ে দেশটির একাধিক উগ্র নেতা লেবাননকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার হুমকি দিয়ে চলেছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জ্বলন্ত করে তুলছে।
ওয়াশিংটন–তেহরান সমঝোতা স্মারককে ঘিরে রাজনৈতিক টানাপোড়েনও তীব্র। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স সতর্ক করে বলেছেন, ইরান-স্মারক মেনে নিতে হলে ইসরায়েলকে তৎপর ও স্পষ্ট পদক্ষেপ দেখতে হবে; তিনি আরও যোগ করেন যে, ইসরায়েল বর্তমানে বিশ্বে বেশিরভাগ দেশের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন এবং যুক্তরাষ্ট্রই তাদের প্রধান মিত্র। এ হুঁশিয়ারির প্রেক্ষিতে ইস্রায়েলি কন্ঠস্বরগুলো তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে।
সমঝোতার বিষয়বস্তু নিয়ে বিতর্ক জোরালো। চুক্তিতে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা সরিয়ে বড় অঙ্কের আটকে থাকা সম্পদ মুক্ত করার ও পুনর্গঠন তহবিল বাড়ানোর কথা এসেছে—যা অনেক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের ডাকাতির মতো ছবি হিসেবে দেখা হচ্ছে। ট্রাম্পের শুরুতে নেওয়া কড়া অবস্থান ধীরে ধীরে শিথিল হওয়ায় অনেকেই বলছেন তিনি প্রাথমিক লক্ষ্যগুলো থেকে পিছু হটেছেন। ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, আঞ্চলিক প্রোক্সি সংগঠনগুলোর অর্থায়ন—এসব ইস্যু চূড়ান্ত চুক্তিতে যতটা ঠেলাঠেলি হয়েছিল, বাস্তবে ততোটাই অস্পষ্ট থাকে। উদাহরণস্বরূপ, সমঝোতায় ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে কোনও বিস্তারিত উল্লেখ নেই; আর প্রোক্সি সংগঠনগুলোর অর্থায়ন বন্ধ করার বিষয়ে সরাসরি আইনি বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি। হরমুজ প্রণালী নিরাপদ রাখার দাবি এসেছে, তবে তা কেবল সীমিত সময়—৬০ দিনের জন্য—বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিশ্চয়তা দেয়।
এ সব মিলিয়ে স্পষ্ট হচ্ছে—চুক্তির খাতগুলোতে থাকা শর্তগুলোর বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত এবং আঞ্চলিক প্রতিপক্ষদের উদ্বেগ না মিটে শান্তি অদূর ভবিষ্যৎ। রাজনৈতিক লক্ষ্য ও কূটনৈতিক বাস্তবতার এই ফাঁকেই সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বড় দারুণ ক্ষত ভোগ করছে।
শেষ দৃশ্যে, ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয়—সাইকস-পিকো থেকে বেলফোর নোট, ক্যাম্প ডেভিড থেকে আব্রাহাম চুক্তি—যতবার বাইরের স্বার্থ ও সুবিধার ভিত্তিতে ভেদাভেদ সমাধান চেষ্টা করা হয়েছে, তথাকথিত শান্তি প্রক্রিয়া বহুবার হালাহলে হয়েছে এবং নতুন সংঘাতের দোড় থেকে গরম হাতিয়ে দিয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে যখন মার্কিন-ইরান শান্তিপ্রচেষ্টা ইসরায়েলকে বাইরে রেখে অবস্থান স্থগিত হলো, তখন স্পষ্ট হয়ে গেল শান্তি যদি অঞ্চলবাসীর ঐতিহাসিক অধিকার, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে কেন্দ্র করে না গড়ে তোলা হয়, ততক্ষণ বন্ধুত্বপূর্ণ চুক্তিও ভঙ্গুর জালেই রয়ে যাবে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে শান্তির সূর্য তখনও অনেক দূরে।






