আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারির ফলে সীমান্তের পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসলেও মাদক কারবারিরা এখন তাদের পাচার কৌশল ও রূপ পরিবর্তন করে আরও চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্র নতুন রুট ও ছদ্মবেশের মাধ্যমে প্রচলিত ফেনসিডিল ও ইয়াবার পরিবর্তে কম দামি, সহজলভ্য এবং ছদ্মবেশী তরল সিরাপ এবং উচ্চমাত্রার ব্যথানাশক ট্যাবলেটের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এর পাশাপাশি, মাত্রাতিরিক্ত কেলেঙ্কারির জন্য মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ও ভারতের সীমান্ত থেকে ‘পুশইন’ পরিস্থিতি এখন বাংলাদেশের সামগ্রিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র ‘স্মার্ট সীমান্ত’ রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে যাতে সহজে ও দ্রুত প্রতিরোধ সম্ভব হয়।
নতুন এই ‘রূপ’:চোরাচালানকারীরা এখন প্রেসক্রিপশনের ওষুধের আড়ালে নিষিদ্ধ মাদক যেন স্বাভাবিকভাবে চালাচ্ছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলা সীমান্তের অন্তত ২৭টি রুট ব্যবহার করে ভারত থেকে আসছে বিষাক্ত সিরাপ যেমন এসকাফ, ফেয়ারডিল, চকোপ্লাস এবং ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট। এই সিরাপগুলোতে উচ্চমাত্রার কোডিন ফসফেট আবদ্ধ থাকায় এর নেশার তীব্রতা নিষিদ্ধ ফেনসিডিলের সমান।
ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট মূলত চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হলেও মাদকসেবীরা এখন এই ট্যাবলেটগুলোও উচ্চমাত্রার নেশাজাতীয় উপাদানে রূপান্তর করে চারিত্রিক পরিবর্তনে কাজে লাগাচ্ছে। এগুলোর সেবা এবং সঠিক পরিমাণ ছাড়াই ব্যবহার হলে লিভার, কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ছাড়াও, কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে আঘাত পেয়ে তরুণদের স্মৃতি, বুদ্ধিমত্তা ও কর্মক্ষমতা দ্রুত কমে যাচ্ছে।
গবেষণা বলছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীর সীমান্ত এলাকাগুলোর অন্তত ২৭টি রুট দিয়ে এসব ক্ষতিকারক সিরাপ ও ট্যাবলেট প্রবেশ করছে। চোরাকারবারিরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ এড়িয়ে সীমান্তের অরক্ষিত ও গ্রামীণ পুখুর, রাস্তা ও পরিত্যক্ত স্থানগুলোকে যুক্ত করেছে পাচারের প্রধান রুট হিসেবে। রাতের আঁধারে এই পথে মাদক স্থানান্তর করে বিভিন্ন গন্তব্যে পাঠানো হয়। এই রুটগুলো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিয়মিত ব্যবহার করা হয়, বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্টগুলো যেমন হাকিমপুর, দুর্লভপুর, কোদালকাটি, বাখের আলী, শিবগঞ্জের বিনোদপুর ও শ্মশানঘাট, মনাকষা, দুর্গাপুর, পাঁকা, তেলকুপি, শিয়ালমারা এবং দাইপুকুরিয়া।
গোয়ালবাড়ী এবং গোমস্তাপুরের সীমান্তগুলোতেও মাদক প্রবেশের প্রবণতা রয়েছে। বিজিবির সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বিএসএফের গুলিতে রেকর্ড ১২,২৪৯ বোতল রিপ্লেসমেন্ট সিরাপ এবং ৫১ হাজারের বেশি নেশাজাতীয় ট্যাবলেট উদ্ধার হয়েছে। জুন মাসে একজন আসামির কাছে থেকে এক হাজার একশ একচল্লিশ বোতল এসকাফ সিরাপ, বাসারিসহ আরও কয়েক হাজার বোতল ও বহু ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করা হয়েছে। এই অভিযানে আরও ৩০ হাজার ৭০০ পিস ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট উদ্ধার করেন বিজিবির সদস্যরা। এগুলো সবই আইনি প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়।
চলমান এই পরিস্থিতি তরুণরা জন্যটা মারাত্মক হওয়ার ব্যাপারে সচেতনতা বেড়ে গেছে। অবৈধ এই ড্রাগগুলো দীর্ঘদিন ব্যবহারে লিভার ও কিডনি নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি, মানসিক রোগ এবং স্মৃতি ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় এক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, বর্তমানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কিছু অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আগে যেসব তরুণ গাঁজা বা ইয়াবা নিয়ে ভাবতেন, এখন তারা নেশামুক্তি জন্য নানা ছদ্মবেশী সিরাপে আসক্ত হয়ে পড়েছে। এটি নিয়ন্ত্রণে না এলে ভবিষ্যতের প্রজন্ম সম্পূর্ণ মেধা ও কর্মক্ষমতা হারিয়ে যেতে পারে।
এর পাশাপাশি নাগরিক সমাজের সচেতনতা বাড়ানোর দাবি উঠছে। মনিরুজ্জামান, সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব, বলেন, এই সকল কৌশলে চোরাচালান বেড়ে চলেছে যা খুবই উদ্বেগজনক। মাদক চোরাচালানের মূল চক্রের গডফাদারদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। সীমান্তে শুধুমাত্র রুটিন অভিযানে এই বিপদ মেটানো সম্ভব নয়, তাদের মূলপথগুলো কঠোরভাবে বন্ধ করতে দরকার।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তে বিজিবি জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে কঠোর অভিযান পরিচালনা করছে। অধিনায়করা বলছেন, যুবসমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই বিপদের হাত থেকে রক্ষা করতে ব্যবস্থা নিতে হবে। বিজিবি সর্বদা সতর্ক অবস্থানে থেকে অবৈধ চোরাচালান প্রতিরোধে কাজ করছে, যাতেএই ধরনের মাদক প্রবেশের পথ বন্ধ হয়।






