কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে সাম্প্রতিক একের পর এক নৌ-ডাকাতি হয়ে উঠেছে জনজীবনের বড় সমস্যা। করিমগঞ্জ, ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের বিভিন্ন নৌপথে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে লাশবাহী নৌকা, গরু-বিক্রেতা, হাঁস ব্যবসায়ী এবং পর্যটকবাহী ট্রলার লক্ষ্য করে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার পর প্রশাসন নৌপথে টহল জোরদার করেছে এবং সন্ধ্যার পর নৌযান চলাচল সীমিত করার নির্দেশ দিয়েছে, যা নিয়ে রাজনৈতিক ও স্থানীয় জনমতও বিবাদে ছেঁড়েছে।
ঘটনাপ্রবাহ: লাশবাহী নৌকা থেকে পর্যটকবাহী ট্রলার
গত ৭ জুলাই রাতে করিমগঞ্জ উপজেলার সুতারপাড়া নোয়াগাঁও স্লুইসগেটে ১৫ দিন বয়সী এক শিশুর মরদেহ বহনকারী নৌকায় মুখোশধারী ছয় ডাকাত উঠে পড়েন। অস্ত্রের মুখে যাত্রীদের থেকে মোবাইল, সোলার ব্যাটারি ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেয় তারা। ঘটনায় এলাকা উত্তাল হয়ে ওঠে।
১৮ ঘণ্টারও কম সময়ে, ৮ জুলাই সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় মিঠামইনের গোপদিঘীর হাওরে তিন গরুব্যবসায়ীর নৌকায় ছয় সদস্যের এক ডাকাত দল হামলা চালায়। ভুক্তভোগীরা বলেন, মারধর করে তাদের কাছ থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয়া হয়। একই দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ইটনার বাদলা ইউনিয়নের বর্শিকুড়া-শেরপুর সংলগ্ন বগাডুবি খালে হাঁস ব্যবসায়ীদের বহনকারী নৌকায় সাত সদস্যের একটি দল হামলা করে; নগদ ৭৫ হাজার টাকা, দুটো মোবাইল, হাঁড়ি-পাতিল ও ইঞ্জিনের সরঞ্জাম লুট করা হয়।
এরও আগে, ৭ জুন রাতে মিঠামইন-করিমগঞ্জ সীমান্তের হাসানপুর ব্রিজ এলাকার একটি পর্যটকবাহী ট্রলারে দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত ডাকাতদল উঠে পড়লে প্রায় ৪০ জন পর্যটকের কাছ থেকে মোবাইল, নগদ অর্থ ও স্বর্ণালংকারসহ প্রায় ৪০ লাখ টাকার মালামাল লুট হয়েছে বলে ভুক্তভোগীরা দাবি করেছেন।
স্থানীয়দের ভীতি, স্বশরীরে পাহারা
ইটনার ছিলনী গ্রামের বাসিন্দা জুয়েল মিয়া বলেন, ‘‘প্রায় প্রতিদিনই চর-বিলে ডাকাতদের ঘোরাফেরা দেখা যায়। গ্রামের লোকজন পালাক্রমে পাহারা দিচ্ছে, তবু ভয়ে কেউ রাতে বাড়ি উঠতে চায় না।’’ মিঠামইনের গোপদিঘীর সাবেক চেয়ারম্যান নূরুল হক বাচ্চু বলেন, ‘‘আগে রাতে চলাচলে ভীতি ছিল না; এখন সন্ধ্যা পর্যন্ত মানুষ দেখতে পারে কী হওয়া যাচ্ছে—ওটা নিয়েই উদ্বেগ।” স্থানীয়রা অভিযোগ করেন যে কিছু গ্রামের লোক ডাকাতদের তথ্য পাঠিয়ে সহযোগিতা করছে।
একই সঙ্গে অনেক গ্রামের মানুষ নিজ উদ্যোগে পাহারাদার নিয়োগ এবং নৌকা নিয়ে ডাকাতদের তাড়া-ধাওয়ারও চেষ্টা করেছেন; কয়েকবার স্থানীয় জেলে ও নৌকা নিয়ে ডাকাতদের অনুসরণ করলেও তারা এলংজুরীর দিকে পালিয়ে গেছে বলে জানা গেছে।
প্রশাসনের পদক্ষেপ ও পদক্ষেপের পরিত্যক্ততা
ডাকাতি বৃদ্ধির পর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের নির্দেশনায় জেলা পুলিশের নৌপ্রহরী টহল শুরু করেছে। জেলা পুলিশ বিকেল সাড়ে ৫টার পর অনির্দিষ্ট করা হলে হাওরাঞ্চলে নৌপথে চলাচল না করতে সাধারণত উপদেশ দিয়েছে। তবে একই সঙ্গে পুলিশ বলছে, এক মাস আগের একটি ঘটনায় জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং সাম্প্রতিক ঘটনা সংক্রান্ত সন্দেহভাজনদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। করিমগঞ্জের বালিখলা ফেরিঘাট, নিকলী বেড়িবাঁধ ও ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম অলওয়েদার সড়ক এলাকায় তিনটি পুলিশ কন্ট্রোল রুমও স্থাপন করা হয়েছে।
রাজনৈতিক নির্দেশ ও বিতর্ক
১২ জুলাই জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও কিশোরগঞ্জ-৬ সংসদ সদস্য মো. শরীফুল আলম বলেছিলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও কঠোর হতে হবে; প্রশাসনের কাছে ডাকাতদের তালিকাও আছে এবং ধারাবাহিক অভিযান চালালে তারা এলাকা ছাড়তে বাধ্য হবে। অন্যদিকে কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-অষ্টগ্রাম-মিঠামইন) আসনের সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান নৌযান চলাচল সীমিত করার সিদ্ধান্তকে তীব্র সমালোচনা করেছেন। ভিডিও বার্তায় তিনি বলেছেন, হাওরবাসীর দৈনন্দিন জীবনে গভীর রাত পর্যন্ত নৌচলাচলের প্রয়োজন থাকে, তাই সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার দাবি করেছেন এবং স্থানীয় জনগণকে সংগঠিত করে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলাসহ তিনটি দ্রুতগামী স্পিডবোট বরাদ্দের দাবি উত্থাপন করেছেন।
সমাজচিন্তা: কিভাবে নিরাপত্তা ফেরানো যাবে
স্থানীয়রা বলছেন—পুলিশি টহল বাড়ানোই একমাত্র সমাধান নয়; দ্রুত গতির আধুনিক জলযান, স্থানীয় জনগণের সাথে সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সন্দেহভাজনদের তথ্যভিত্তিক গ্রেপ্তার প্রয়োজন। অনেকেই পাহারার মধ্যে থাকলেও রাতের অন্ধকারে অনিরাপদ হিসেবেই হাওর জেগে আছে। মসজিদের মাইকে ডাকাতের উপস্থিতি জানানোর ঘটনা ও পরে ওই মসজিদের মুয়াজ্জিন আবদুল মতিনকে হুমকির ঘটনাও গ্রামে আতঙ্ক আরো বাড়িয়েছে—স্থানীয়রা বলছেন, গ্রাম পর্যায়ে আওয়াজ তুলতে গেলে দৃষ্টান্ত দেখানোর মানসিকতা থেকে লোকেরা ঘাবড়ে যায়।
পুলিশ জানিয়েছে—প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চলছে এবং দায়ী যারা থাকবে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। স্থানীয় নেতারা বলছেন, প্রশাসন ও কমিউনিটির সমন্বিতভাবে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নিলে হাওরাঞ্চলের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতা বাড়তেই থাকবে।






