ইউক্রেন যুদ্ধে উত্তেজনার মাঝেও ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে রাশিয়ার ইয়ামাল এলএনজি প্রকল্প থেকে শুরু হয়েছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সর্বোচ্চ মাত্রার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি। রাশিয়ার ওপর জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার ঠিক কয়েক মাস আগে সাইবেরিয়ার এই বড় প্রকল্পের প্রায় মূল উৎপাদনই ইউরোপের বাজারে পৌঁছেছে।
বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্যে দেখা যায়, বছরের প্রথমার্ধে ইয়ামাল এলএনজি থেকে ইউরোপীয় দেশগুলো মোট প্রায় ৯৮ লাখ ৯০ হাজার টন গ্যাস আমদানি করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ বেশি। পরিসংখ্যানগুলো ইঙ্গিত করছে যে যুদ্ধের পঞ্চম বর্ষেও ইউরোপের অর্থনৈতিক চাহিদা ও বাজারই রাশিয়ার এই জ্বালানি খাতকে সক্রিয় রাখতে বড় ভূমিকা রাখছে।
বেসরকারি সংগঠন উরগেভাল্ডের হিসাব অনুযায়ী, ওই পরিমাণ এলএনজি কেনার বিনিময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়াকে প্রায় ৬০০ কোটি ইউরো পরিশোধ করেছে। দেশভিত্তিকভাবে দেখা যায়, ফ্রান্সই সর্বোচ্চ গ্রহণকারী — প্রথম ছয় মাসে প্রায় ৩৬ লাখ টন; এর পরে বেলজিয়াম (২৯ লাখ টন) ও স্পেন (২৭ লাখ টন) রয়েছে।
উরগেভাল্ডের নিষেধাজ্ঞা বিষয়ক প্রচারক সেবাস্টিয়ান রোটার্স এই পরিসংখ্যানকে ‘উদ্বেগজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন এবং বলেছেন যে, রাশিয়ার হামলার তীব্রতা বাড়ার পরও ইউরোপের এই আমদানি অব্যাহত থাকা নৈতিক ও নীতিগত প্রশ্ন তোলে।
বর্তমান ইইউ বিধি অনুযায়ী স্বল্পমেয়াদি বা স্পট চুক্তির মাধ্যমে রাশিয়ার এলএনজি কেনা নিষিদ্ধ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ক্ষেত্রে ছাড় রয়েছে। তাই ইয়ামাল এলএনজি থেকে আসা প্রতিটি চালানকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় আনার দাবি করা হয়। তবে আগামী ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে রাশিয়ার এলএনজি আমদানি সবদিক দিয়ে নিষিদ্ধ হওয়া লক্ষ্যে প্রতিশ্রুতি নেওয়া হয়েছে, যা রাশিয়াকে নতুন বাজার খুঁজতে বাধ্য করবে।
প্রকল্পের সফলতায় বড় ভূমিকা রেখেছে বিশেষায়িত ‘আর্ক৭ আইস-ক্লাস’ ট্যাংকারগুলো। এসব আইস-ক্লাস জাহাজ দ্রুত এবং নিরাপদে ইউরোপীয় বন্দরগুলোতে পৌঁছাতে সক্ষম হওয়ায় রাশিয়ার রফতানি কার্যক্রম সহজ হয়েছে। তুলনায় এশিয়া পৌঁছানো পথ বেশি দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ থাকায় চলতি বছরের প্রথমার্ধে ইয়ামালের এশিয়া রপ্তানি প্রায় ৭৪ শতাংশ কমে মাত্র ৫ লাখ ১০ হাজার টনে নামেছে।
তবে এই আইস-ক্লাস জাহাজগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের জন্য রাশিয়া এখনও অনেকটাই ইউরোপীয় শিপইয়ার্ডের ওপর নির্ভরশীল; বিশেষ করে ফ্রান্স ও ডেনমার্কের সার্ভিসগুলোর ওপর। উরগেভাল্ডের সেবাস্টিয়ান রোটার্স মন্তব্য করেছেন, ‘ইয়ামাল এলএনজি একটি ছোট বিশেষায়িত জাহাজ বহর, যা ইউরোপীয় বন্দর ও ইউরোপীয় সেবার ওপর নির্ভর করে রপ্তানি কার্যক্রম চালায়। ইউরোপ এখনও এই তিনটি সুবিধাই দিয়ে যাচ্ছে।’
ইয়ামাল এলএনজি প্রকল্প ২০১৭ সালে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দ্বারা উদ্বোধন করা হয় এবং বর্তমানকালে এটি রাশিয়ার বৃহত্তম এলএনজি উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর একটি। নোভাটেকের মালিকানাধীন এই প্রকল্পে ফ্রান্সের টোটালএনার্জিস ও চীনের সিএনপিসি অংশীদার হিসেবে রয়েছে।
টোটালএনার্জিসের প্রধান নির্বাহী প্যাট্রিক পুয়ানে গত ফেব্রুয়ারিতে এক বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন যে, ইইউ নিষেধাজ্ঞার বিধানগুলোতে কিছু ‘অস্পষ্টতা’ থাকার কারণে প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজনে শুধু ইউরোপে নয়, পুরো ইয়ামাল প্রকল্প থেকে গ্যাস রপ্তানি বন্ধ করতেও বাধ্য হতে পারে। ভবিষ্যতে রাশিয়ার এলএনজি রপ্তানি ও বাজার সীমাবদ্ধতা কিভাবে বদলে যাবে— তা এখনও অনিশ্চিত রয়েছে।






