বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের (৫ আগস্ট ২০২৪) পর থেকে ভারতের আরোপ করা বিধিনিষেধ ও শর্তের কারণে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে রপ্তানি বাণিজ্যে তীব্র পতন দেখা দিয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেনাপোল দিয়ে ভারতে রপ্তানি হয়েছিল মোট ৩ লাখ ৮১ হাজার ৪৪০ মেট্রিক টন। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসে দাঁড়ায় মাত্র ১ লাখ ৯২ হাজার ৮২ মেট্রিক টনে। এক বছরে বেনাপোলের মাধ্যমে ভারতে রপ্তানি প্রায় ১ লাখ ৮৯ হাজার ৩৫৮ মেট্রিক টন কমেছে।
রপ্তানি-আমদানি অনুপাতের এই বিস্তর বৈষম্য প্রতিদিনের ট্রাফিকেও পরিলক্ষিত হচ্ছে। একাধিক দিনের ট্রাক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, কোনো কোনো দিন ভারতের থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করা পণ্যবাহী ট্রাকের সংখ্যা ৩০৫ পর্যন্ত থাকলেও বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানি করা ট্রাক মাত্র ৪৪টি—যা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে এককপাক্ষিক অসাম্যকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারতের একের পর এক শর্ত ও নিষেধাজ্ঞাই এমন ভারসাম্যহীন পরিস্থিতির মূল কারণ।
সূত্রগুলো জানান, ২০২৫ সালের ৮ এপ্রিল থেকে ভারত সড়কপথে তাদের বিমানবন্দর ব্যবহার করে তৃতীয় দেশে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। এরপর ১৫ এপ্রিল সড়কপথে পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এবং ১৭ মে জারি করা আরেকটি প্রজ্ঞাপনে স্থলপথে তৈরি পোশাক, সুতা, প্লাস্টিক, কাঠজাত পণ্য এবং ফল-মূল আমদানিতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ভারত। এসব একতরফা নিষেধই বেনাপোল বন্দর দিয়ে রপ্তানিতে বড় ব্যাঘাত সৃষ্টি করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেন।
বেনাপোল আমদানি-রপ্তানি সমিতির সহসভাপতি আমিনুর হক বলেন, ‘‘নতুন গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের পরও ভারত তাঁদের এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেনি। এর ফলে বেনাপোলের মাধ্যমে রপ্তানি প্রায়শই থমকে যাচ্ছে, যা ব্যবসা ও স্থানীয় অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে।’’ বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের দপ্তর সম্পাদক মোস্তাফিজ্জোহা সেলিম বলেন, ‘‘ভারত এভাবে বাধা দিচ্ছে—তাহলে আমাদের দ্রুত বিকল্প বাজারের সন্ধান করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারকে কূটনৈতিকভাবে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং বিকল্প বাজার সম্প্রসারণে তৎপর হতে হবে।’’
সংক্রান্তি ভাবনায় আঞ্চলিক সমাধানের কথাও বলা হচ্ছে। ভারত-বাংলাদেশ ল্যান্ডপোর্ট ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট কমিটির সভাপতি মতিয়ার রহমান মনে করেন, ভারত-বাংলাদেশ-নেপাল-ভুটান (BBIN) ট্রানজিট সুবিধা ব্যবহার করে নেপাল ও ভুটানে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি বাড়ালে বর্তমান বাণিজ্য ঘাটতি অনেকাংশে কাটানো সম্ভব। এ ধরনের আঞ্চলিক রুট সক্রিয় করলে প্রবাহ ফিরে আসার পাশাপাশি নতুন বাজারও তৈরি হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বেনাপোল স্থলবন্দর পরিচালক শামিম হোসেন জানিয়েছেন, বন্দরের মাধ্যমে রপ্তানি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে এবং পরিধি বৃদ্ধি করতে কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। তবে ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য কূটনৈতিক চাপ বাড়ানো, বিকল্প রুট ও বাজার খোঁজা ও আঞ্চলিক সমন্বয় জরুরি। তৎক্ষণিক নীতি ও কার্যকর বাস্তবায়ন না হলে বেনাপোল ভিত্তিক রপ্তানি-আর্থিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে বলে সতর্কতা জানিয়েছে ব্যবসায়ী মহল।






