যাত্রী ও পণ্য পরিবহন সম্প্রসারণ, নতুন ট্রেন চালু, ডিজিটাল টিকিটিং এবং প্রশাসনিক সংস্কারের ফলে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে বাংলাদেশ রেলওয়ের রাজস্ব আয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যাত্রীভাড়া অপরিবর্তিত থাকার পরও আগের বছরের তুলনায় রাজস্ব বৃদ্ধির উল্লেখযোগ্য ছোঁয়া পেয়েছে, যা রেলের আর্থিক সংস্কারের ইতিবাচক ফল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রেলওয়ের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির মোট রাজস্ব আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ১০০ কোটি টাকা; যেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ওই আয় ছিল ১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে রাজস্ব আয় বাড়েছে ২২১ কোটি টাকা, বলেছে বাংলাদেশ রেলওয়ের জনসংযোগ শাখার পরিচালক আনিসুর রহমান। তবে ইঞ্জিন সংকটের কারণে পণ্য পরিবহন থেকে আয় কমে behaviour—প্রায় ৯ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যেও দেখা গেছে, বর্তমান রেলওয়ে সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম ও মহাপরিচালক আফজাল হোসেন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রশাসনিক ও আর্থিক সংস্কারের কাজ ত্বরান্বিত হয়েছে। তাদের নেতৃত্বে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, নিয়মিত যাচাই-বাছাই ও তদারকি করে অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক তদবির, দুর্নীতি ও ঘুষ প্রতিরোধ করে প্রশাসনিক পরিবেশকে প্রভাবমুক্ত করার উদ্যোগ আর্থিক ভিত্তি শক্ত করতে ভূমিকা রেখেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের রাজস্ব বৃদ্ধির প্রধান অংশ এসেছে যাত্রী পরিবহন খাত থেকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই খাতে আয় বেড়েছে ২৫৬ কোটি টাকা। নতুন ট্রেন সংযোজন, যাত্রীসেবা সম্প্রসারণ, অনলাইন ও ডিজিটাল টিকিটিং ব্যবস্থা চালু এবং যাত্রীসংখ্যার বৃদ্ধিই এই প্রবৃদ্ধির মূল কারণ।
অন্যদিকে, ইঞ্জিন সংকটের প্রভাবেই মালামাল পরিবহনের আয় প্রায় ৯ কোটি টাকা কমেছে। এছাড়া পরিবহন ও বাণিজ্যিক খাত—যেখানে ভেন্ডিং লাইসেন্স ও অন্যান্য বাণিজ্যিক আয় অন্তর্ভুক্ত—সেখানেও রাজস্ব প্রায় ২৫ কোটি টাকা কমেছে। রেল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইঞ্জিনের ঘাটতি দূর করে মালবাহী ট্রেনের সংখ্যা বাড়ালে এই খাত থেকে রাজস্ব পুনরায় বাড়ানো সম্ভব।
কিছু খাতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিও ধরা পড়েছে। ভূসম্পত্তি ব্যবস্থাপনা থেকে আয় বাড়েছে প্রায় ৩ কোটি টাকা এবং রেলওয়ের অপটিক্যাল ফাইবার লিজ থেকে আয় বেড়েছে প্রায় ১২ কোটি টাকা।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেলের মোট পরিচালন ব্যয় ছিল প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, পেনশন, রেলপথ ও রোলিং স্টকের রক্ষণাবেক্ষণ এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় অন্তর্ভুক্ত। এ হিসেবে আয়-ব্যয়ের অনুপাত বা অপারেটিং রেশিও দাঁড়িয়েছে ১.৯১, যেখানে আগের অর্থবছরে এটি ছিল ২.৯। অর্থাৎ এক বছরের মধ্যে আয়-ব্যয়ের ব্যবধান হ্রাস পেয়েছে, যা ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক শৃঙ্খলা বাড়ার প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে।
রেল কর্তৃপক্ষ আরো জানায়, প্রতিবছর প্রায় এক হাজার কোটি টাকা পেনশন বাবদ ব্যয় হয়, যা সরাসরি ট্রেন পরিচালনার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নয়। পেনশন ব্যয় বাদ দিলে পরিচালন ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২,৯৫৫ কোটি টাকা এবং অপারেটিং রেশিও নেমে আসে ১.৪৩। অর্থাৎ পেনশন ব্যয় বাদ দিলে রেলের পরিচালন ব্যয় রাজস্ব আয়ের তুলনায় অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে একটি রাষ্ট্রীয় গণপরিবহন প্রতিষ্ঠান হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে যাত্রীভাড়া রেয়াতি হারে ধরা আছে; ২০১৬ সালের পর থেকে ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়নি। একই সময়ে রেলপথ ও ট্রেন রক্ষণাবেক্ষণের খরচ, আমদানিনির্ভর যন্ত্রাংশের মূল্য, ডলারের বিনিময় হার, জ্বালানি মূল্য এবং কর্মী বেতনের খরচ সবই বাড়েছে। রেল সংশ্লিষ্টদের মতে, বাজারদর ও অন্যান্য পরিবহন ব্যবস্থার ভাড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য করে যৌক্তিকভাবে ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করলে আয়-ব্যয়ের খাঁজ আরও ছোট হবে। সেবার মান উন্নয়ন ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা অব্যাহত থাকলে রেলওয়ে আর লোকসানি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত থাকবে না—এই আশাবাদও প্রকাশ করেন তারা।






