প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য উদ্দীপনা জুগিয়েছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আমেরিকান বিনিয়োগকারীরা সরকারিভাবে সহযোগিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশের উন্নতির মাধ্যমে বাংলাদেশে তাদের ব্যবসা আরও বিস্তার করবেন। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) সকালে নিজ দপ্তরে ইউএস–বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের ৫০ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এই বার্তা দেন।
প্রতিনিধিদলে নেতৃত্বদান করেন এক্সিলারেট এনার্জির নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ও চিফ কমার্শিয়াল অফিসার অলিভার সিম্পসন, এবং ইউএস–বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ও ইউএস চেম্বার অব কমার্সের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট রাষ্ট্রদূত (অব.) অতুল কেশপ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের ছয় মাসের এই দূরদর্শী সরকার চায়, মার্কিন কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগ করুক এবং তাদের ব্যবসা বিস্তার করুক। তিনি যোগ করেন, আমরা আপনাদের পুঁজি, প্রযুক্তি, দক্ষতা এবং বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাকে স্বাগত জানাই।
বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে—আসুন, ব্যবসাবান্ধব বাজেট, সহজীকরণ নীতি, এবং ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে ব্যবসার পরিবেশ আরো এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তিনি জোর দেন, বাংলাদেশের লক্ষ্য হলো এমন একটি নিয়মভিত্তিক, বিশ্বসংযোগযুক্ত অর্থনীতি গড়ে তোলা, যেখানে মার্কিন কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণে একটি সমৃদ্ধ বিনিয়োগ ক্ষেত্র সৃষ্টি হবে।
প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, জ্বালানি, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, ডিজিটাল সেবা, অর্থনীতি, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, উৎপাদন ও লজিস্টিকসের বিষয়গুলোতে মার্কিন ব্যবসার জন্য বাংলাদেশে ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। তিনি জানান, সরকার বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা বৃদ্ধির জন্য নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, যেমন বিধি-নিষেধ সহজীকরণ, কর ও ভ্যাটের প্রশাসন উন্নতি, মুনাফা প্রত্যাবাসন সহজকরণ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, এবং সরকারি সেবা ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়া চালাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, আমরা অবকাঠামো, বন্দর, লজিস্টিকস ও জ্বালানি নিরাপত্তার উন্নয়নও অব্যাহত রেখেছি। সেই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও আধুনিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের জন্য উৎসাহ প্রদান করছি।
মার্কিন ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমার বার্তা খুবই সরল। বাংলাদেশে আপনারা ব্যবসায়িক স্বার্থের বিষয়ে আমাদের শুনুন, সহযোগিতা পেতে সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত। পুরো সরকারই আপনাদের জন্য একটি পুরোপুরি সহায়ক অংশীদার।’ তিনি আরো বলেন, সরাসরি বিনিয়োগ, যৌথ উদ্যোগ, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব ও পরামর্শ সেবার মাধ্যমে বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগ স্বাগত।
প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দেন যে, দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী এবং পারস্পরিক লাভজনক অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে, এবং ২০৩৪ সাল নাগাদ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তিনি বলেন, ‘আমরা লক্ষ্য করছি, অগ্রাধিকার খাতে লক্ষ্যভিত্তিক প্রণোদনা, দক্ষতা ও প্রযুক্তির বিনিয়োগ, যা বাংলাদেশকে বিনিয়োগ ও উৎপাদনের কেন্দ্র করে তুলবে।’ তিনি উল্লেখ করেন, কেবল বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগই নয়, বরং একটি দীর্ঘস্থায়ী এবং পারস্পরিক সুবিধা নিশ্চিত করে এমন অংশীদারিত্বই আমাদের আসল লক্ষ্য।
প্রধানমন্ত্রী জানান, রাজনীতিতে আসার আগে নিজেও একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। তাই ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য দরকারি নীতি ও উপযুক্ত পরিবেশে তিনি গভীরভাবে আস্থা রাখেন।
সফররত ব্যবসায়ী নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমার বার্তা খুব সহজ। বাংলাদেশের সরকার আপনাদের স্বার্থের বিষয়গুলো শুনতে, সাড়া দিতে এবং সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। আপনাদের পুরোপুরি অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করুন।’ তিনি আশ্বাস দেন, প্রয়োজনীয় সব রকম সহযোগিতা দেওয়া হবে।
উদ্দেশ্য হচ্ছে মার্কিন কোম্পানিগুলোর আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি, দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসা প্রতিষ্ঠা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, এবং দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় করা। তিনি বলেন, ‘আসুন, একসাথে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অর্জন করি এবং একটি প্রতিযোগিতামূলক, বৈশ্বিক সংযুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলি।’
প্রতিনিধিদল পূর্বে বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে। প্রধানমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন, এসব বৈঠক বাংলাদেশের অগ্রাধিকার ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা সম্পর্কে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীদের ধারণা আরও সুদৃঢ় করবে।
তিনি অবশেষে সবাইকে সফল সফর কামনা করে বলেন, ‘আমাদের সরকার সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত।’
প্রতিনিধিদলে আরও ছিলেন মাস্টারকার্ডের গ্লোবাল পাবলিক পলিসি ও ইন্দো-প্যাসিফিক পলিসি বিভাগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট রবি অরোরা, মাস্টারকার্ড বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার জাকিয়া সুলতানা, মেটার দক্ষিণ এশিয়ার পাবলিক পলিসি পরিচালক চা ইউয়েন টিং, মেটা বাংলাদেশের হেড অব পাবলিক পলিসি রুজান সারওয়ার, ইউএস সয়াবিন এক্সপোর্ট কাউন্সিলের মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক নির্বাহী পরিচালক কেভিন রোপ, বাংলাদেশে ইউএস সয়াবিন এক্সপোর্ট কাউন্সিলের বাংলাদেশ কান্ট্রি টিম লিড খবিবুর রহমান, ভিসার ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার গভর্নমেন্ট অ্যাফেয়ার্স বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান আনন্দ বিজয় ঝা, ভিসার বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের কান্ট্রি ম্যানেজার সাব্বির আহমেদ।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বোয়িংয়ের দক্ষিণ এশিয়া ও ভারতের প্রেসিডেন্ট এবং বোয়িং গ্লোবাল ভাইস প্রেসিডেন্ট সলিল গুপ্তে, শেভরনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শু শিয়ং, মেটলাইফের বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, নেপাল ও ভিয়েতনাম অঞ্চলের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এলেনা বুতারোভা, উবারের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের পাবলিক পলিসি ও গভর্নমেন্ট রিলেশনস বিভাগের প্রধান পিয়া ব্রুনার, এবং ইউএস–বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক নির্বাহী পরিচালক সিদ্ধান্ত মেহরা।
এ ছাড়াও ছিলেন বিভিন্ন মন্ত্রীর প্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তারা। এই বৈঠক ও সংলাপগুলো দুই দেশের ব্যবসা ও বিনিয়োগ সম্পর্কের এগিয়ে যাওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশনা দিয়েছে বলে তিনি মনে করেন।






