জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পরিবর্তনশীল ধারার অব্যাহত প্রবাহের মধ্যেই নতুন মোড় এসেছে। ফরিদপুরের তত্ত্বাবধায়ক ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য সৈয়দা নীলিমা দোলা দলে থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। শনিবার বিকেলে নিজের ফেসবুক পেজে এক বিস্তৃত বিবৃতির মাধ্যমে তিনি এই সিদ্ধান্তের কথা জানান এবং নিজের পদত্যাগপত্রটি জনসম্মুখে প্রকাশ করেন। নীলিমা দোলা ফরিদপুর জেলা মহিলা লীগের সভাপতির মেয়ে, এবং সম্প্রতি তিনি এনসিপির সক্রিয় চেয়ারম্যান হিসেবে যুক্ত ছিলেন। তাঁর এই পদত্যাগ দলের আদর্শিক ধারায় বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, বর্তমানে এনসিপির মূল পথ এখন আর মধ্যপন্থী বা সেন্ট্রিস্ট রাজনীতির জন্য উপযুক্ত নয়। এ ধরনের মতামত দিয়ে তিনি দলটির ভেতরে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
নীলিমা দোলার অভিযোগের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল দলটির সাম্প্রতিক ডানপন্থী ঝোঁক ও জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী জোটের বিষয়। তিনি বলেন, এখন এনসিপি সম্পূর্ণভাবে ডানমুখো হয়ে পড়েছে, এবং সেই ধারার রাজনীতিকেই তারা সরাসরি পৃষ্ঠপোষতা দিচ্ছে। তাঁর মতে, জামায়াতের সঙ্গে এই জোট কোনো কৌশলগত সমঝোতা নয়, বরং এটা দলীয় নেতাকর্মীদের চোখে ধুলো দিয়ে করা এক ধরনের চুক্তি। মনোনয়নপত্র প্রদান যেন প্রতারণার মতোই একটি প্রক্রিয়া চালু হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। যারা দল থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছেন, তাদের ‘বামপন্থী’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা দলে চলছিল, যা তিনি নেতাদের একটি পরিকল্পিত ‘গেম প্ল্যান’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, যাতে দলের এই পরিবর্তনকে বৈধতা দেওয়া সহজ হয়।
তাঁর বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, দলটির ভেতরে থেকে নারী, শিশু, শ্রমিক, আদিবাসী এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘু প্রান্তিক মানুষের অধিকার আদায়ে তিনি নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। তবে তাঁর আক্ষেপ, গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকার আমলে এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উপর চলা নির্যাতন ও অনাচারের বিরুদ্ধে দলটির তরুণনির্ভর সংগঠনটি যথেষ্ট সোচ্চার হতে পারেনি। তিনি বলেন, এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে দলের উদাসীনতা ও দায়সার মনোভাব তাঁর মতামতের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। তিনি মনে করেন, জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের জনগণ এই দলের ওপর যে আস্থা রেখেছিল, নেতৃত্বের অযৌক্তিক সিদ্ধান্তের কারণে তা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে।
সবশেষে, সৈয়দা নীলিমা দোলা এক কঠোর বার্তা দিয়ে বলেন যে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ঘটতে যাওয়া অভ্যুত্থান কোনো ধর্মীয় বিপ্লব ছিল না, এবং এর সুফল ঘরে তুলতে ধর্মীয় রাজনীতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা শহীদদের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। তিনি অভিযোগ করেন, এনসিপি বর্তমানে এই অভ্যুত্থানকে ধর্মীয় মোড়কে ভরে পুরোনো আওয়ামী লীগীয় বয়ানকে পুনরুদ্ধার করার দিকে এগোচ্ছে। তিনি বর্তমান নেতৃত্বকে ভবিষ্যতের জন্য শুভকামনা জানালেও, বিশ্বাস করেন যে, দেশের সাধারণ মানুষ এই অসংগতি ও অপচেতনির যথাসাধ্য জবাব দেবে। এছাড়াও, তিনি উল্লেখ করেন যে, এনসিপি ছাড়াও জুনের সময়ে আরেকটি শক্তিশালী পক্ষও সক্রিয় রয়েছে—এমন ধারণা দিয়ে তিনি তাঁর রাজনৈতিক সংগ্রামের নতুন দিগন্তের ইঙ্গিত দিয়েছেন।






