মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশের উপরে প্রকট আকারে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। জ্বালানি সংকটের কারণে গ্যাসের দাম ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, ফলে কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং সার উৎপাদনও কমে যাচ্ছে। এর ফলে পরিবহন, কৃষি, খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং মানুষের জরুরি আয়-রোজগারের ওপর চাপ বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের এক মূল্যায়নে বলা হয়, যদি এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বাংলাদেশে প্রায় ছয় লাখ মানুষ কর্ম হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। একই সঙ্গে, এই দুর্যোগের কারণে চলতি বছরে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার স্বপ্ন দেখছিলেন যারা, তাদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। এই মূল্যায়ন জুনের মাঝামাঝি সময়ে করা হয়, একটি বাজেট সহায়তা প্রকল্পের অংশ হিসেবে।
বর্তমানে অর্থনীতি আগে থেকেই চাপে রয়েছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংক খাত ও সরকারের সীমিত অর্থায়নের কারণে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ এখনও যথেষ্ট তৈরি হয়নি। বিশ্বব্যাংকের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, আগামী ২০২৫ সালে দেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসরত মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ১৪ লাখ বৃদ্ধি পাবে। তবে, যদি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ না হয়, তাহলে এই সংখ্যা ১৭ লাখের মতো কমে যেতে পারত। কিন্তু যুদ্ধের প্রভাবে তা কমে গিয়ে এখন প্রায় ৫ লাখে দাঁড়িয়েছে, অর্থাৎ আরও ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বের হওয়ার সুযোগ হারাতে পারেন।
বিশ্বব্যাংকের মতে, এই বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে দারিদ্র্য বৃদ্ধির মূল কারণ হিসেবে মূল্যবৃদ্ধি দায়ী, যার প্রভাব প্রায় ১০ শতাংশ। জ্বালানির দাম বাড়তে থাকলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ আরও বাড়বে, যার ফলে মূল্যস্ফীতি শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে। দাম বাড়ার প্রভাবে পরিবহন খাতে ব্যয় বাড়বে, বিদ্যুৎ উৎপাদন কঠিন হয়ে পড়বে এবং শিল্পকারখানার খরচও বৃদ্ধি পাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে খাদ্য ও অন্যান্য পণ্যের দামে।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খান মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি উল্লেখ করেছেন, জুলাই মাসে দেশের বাজেটের জন্য এবছর মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। তিনি এই ধারা অব্যাহত থাকলে পর্যায়ক্রমে মূল্যস্ফীতি আরও কমে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সরাসরি প্রভাবের কারণে দেশের জ্বালানি খাতে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। দেশের জ্বালানি সরবরাহের অর্ধেকের বেশি আসে গ্যাস থেকে। ২০১৬ সালে দেশের সর্বোচ্চ উৎপাদন থেকে গ্যাসের ক্ষেত্রে দেখা গেছে ১৫ শতাংশ কমতি। পাশাপাশি, আমদানি করা অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি তো বটেই, মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে ৬০-৬৫ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এবং ৫৫-৬০ শতাংশ এলএনজিও।
যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সঙ্কট সৃষ্টি হওয়ায় পেট্রোবাংলার ছয়টি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির মধ্যে পাঁচটিকে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করা হয়েছে। গত সেপ্টেম্বরের মধ্যে, আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ২৪ থেকে ২৮ ডলার পর্যন্ত উঠেছে, যা আগের দামের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি। এই পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশকে প্রতি ইউনিট এলএনজির জন্য গত মাসে দেড়গুণ বেশি অর্থপ্রদান করতে হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকি জিডিপির ২ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, আর এই ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ২.৫ বিলিয়ন থেকে ৪.৮ বিলিয়ন ডলারে। এর ফলে, অন্য খাতে সরকারি ব্যয় কমানোর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব কৃষি খাতেও পড়েছে। দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ এক أو অন্যভাবে কৃষির উপর নির্ভরশীল। সার উৎপাদন ও আমদানিতে সমস্যা দেখা দেওয়ায়, ছোট কৃষকরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন। দেশে এক হেক্টর জমিতে গড়ে ৩৯১ দশমিক ৯ কেজি সার ব্যবহার হয়, যা গড়ের দ্বিগুণ। গ্যাসের সংকটের কারণে ছয়টি ইউরিয়া কারখানার পাঁচটি উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে, এই পরিস্থিতিতে ইউরিয়া সার ও এর দাম বেড়ে প্রায় ৩০ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা, দীর্ঘস্থায়ী সংকটে সারের দাম আরও দ্বিগুণ হতে পারে।
স্বাস্থ্যখাতও এই জ্বালানি ও সরবরাহ সঙ্কটের প্রভাব অস্বীকার করতে পারে না। দেশে প্রায় ১৯ হাজার সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ৬২৯২টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ সঙ্কটের কারণে, বেসরকারি হাসপাতালগুলো জেনারেটর চালানোর জন্য বেশি ব্যয় করছে। এর পাশাপাশি, বাংলাদেশের ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগই বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করে, এবং দেশের ৯০ শতাংশ হাসপাতালের সরঞ্জাম বিদেশি। জাহাজ ভাড়ায় অসুবিধার কারণে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের ফলে বাংলাদেশের কর্মসংস্থানে ধাক্কা লেগেছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নতুন গ্যাস সংযোগ দেওয়া হচ্ছে না, অনেক কারখানা কাজের সময় কমিয়ে দিচ্ছে বা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কারখানা বন্ধ হওয়া এবং শ্রমিকদের চাকরি হারানো এই সংকটের কঠিন চিত্র ফুটিয়ে তোলে। বিশ্বব্যাংকের ৬ লাখ চাকরি হারানোর আশঙ্কাও এই পরিস্থিতিরই প্রতিফলন।’
সার্বিকভাবে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য শুধু জ্বালানি সংকটই নয়, এটি কর্মসংস্থান, কৃষি, মূল্যবৃদ্ধি, দারিদ্র্য ও স্বাস্থ্যসেবায় একযোগে চাপ সৃষ্টি করছে। এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে নিম্নআয়ের মানুষ, কারণ তারা এই সমস্ত বোঝা বহন করতে সবচেয়ে বেশি সমর্থ।






