শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার চামটা ইউনিয়নের দিনারা গ্রামের আমির হোসেন ৩০ বছর পর পরিবারের কাছে ফিরে গেছেন। মালয়েশিয়ায় দীর্ঘ সময় নিখোঁজ থাকার পর মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) গভীর রাতে তিনি দেশে পৌঁছেন। স্বামীকে পেয়ে স্ত্রী রোকেয়া বেগম ও ছেলেমেয়েরা আবেগে আপ্লুত হন।
রোকেয়া বেগম ও আমির হোসেনের সংসারে তিন ছেলে ও তিন মেয়ে—অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফিরাতে ১৯৯৬ সালে পুরুষ সদস্যরা কিছু জমি বিক্রি করে দালালের মাধ্যমে আমির হোসেন মালয়েশিয়ায় যান। সেখানে রংমিস্ত্রির কাজ শুরু করেন এবং প্রথম তিন বছর পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও টাকা পাঠাতেন। কিন্তু এরপর হঠাৎ করে তার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়; পরের ২৭ বছর পরিবারের কোনো খবর পাননি।
ছয় মাস আগে মালয়েশিয়ার পেনাংয়ের এক জঙ্গলে ছোট একটি টিনের ঘরে মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন অবস্থায় তাকে দেখতে পান একজন প্রবাসী দীপু ও প্রবাসী সংবাদকর্মী বাপ্পি কুমার দাস। তারা তাকে উদ্ধার করে ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। সেই ভিডিও দেখে পরিবারের সদস্যরা তাকে শনাক্ত করেন এবং ভিডিও পোস্টকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করে কয়েক দফা ভিডিও কলে আলাপ-আলোচনা করেন। এরপর দীর্ঘ ছয় মাসের প্রচেষ্টার পর দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হয়।
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের দূতাবাস কর্তৃপক্ষ আমির হোসেনের ছবি ও তথ্য নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুল কাইয়ুমকে পাঠান। উপজেলা প্রশাসন যাচাই-বাছাই করে চামটা ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে জন্মনিবন্ধন করিয়ে দেয়। ওই জন্মনিবন্ধন ও পরিবারের অন্যান্য ডকুমেন্ট দূতাবাসে পাঠানোর পর তাকে ট্রাভেল পাস দিয়ে দেশে ফেরত আনা হয়। তিনি গত মঙ্গলবার রাত ১২:২০ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছান।
বিমানবন্দরে সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটি (এভসেক) ও প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের সহায়তায় ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও পরিবারের সদস্যরা তাকে গ্রহণ করেন। বিমানবন্দরের কার্যক্রম শেষে তাকে নেওয়া হয় ঢাকার কেরানীগঞ্জে ছোট ছেলে শহীদুল ইসলামের বাড়িতে, যেখানে বর্তমানে তিনি বিশ্রামে আছেন।
স্বামী ফিরে আসার খবর পেয়ে ঢাকায় ছেলেদের কাছে ছুটে যান রোকেয়া বেগম; বিমানবন্দরে স্বামীকে কাছে পেয়ে তিনি আবেগে আপ্লুত হন। রোকেয়া বেগম বলেন, ‘‘ছয় শিশুসন্তান রেখে তিনি মালয়েশিয়ায় যান। প্রথম তিন বছর টাকাও পাঠিয়েছেন, হঠাৎ করে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ২৭ বছর ধরে তাকে খুঁজেছি—বেঁচে আছেন কি না, কোনো খবর পাইনি। ছয় মাস আগে একটি ভিডিও দেখে আমরা তাকে চিনতে পারি; এরপর থেকেই বাড়ি ফেরানোর জন্য অনুরোধ করেছি। স্বামীকে এত বছর পর ফিরে পেয়েছি—এটা আমার জীবনের অবিস্মরণীয় ঘটনা।’’
পরিবার সূত্রে জানা যায়, তাদের বড় ছেলে তিন বছর আগে মারা গেছেন। তিন মেয়ে বিয়ে করে শ্বশুরবাড়িতে থাকেন। বেঁচে থাকা দুই ছেলে ঢাকায় শ্রমিকとして কাজ করেন ও কেরানীগঞ্জে ভাড়া বাসায় বাস করেন।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান বলেন, ‘‘৩০ বছর ধরে একজন প্রবাসে থাকা এবং ২৭ বছর ধরে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকায় ঘটনাটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। প্রবাসী বাংলাদেশিরা পরিবারের খোঁজ-খবর রাখায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। শুধু একজন ব্যক্তির নয়, একটি পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান এটা।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘প্রবাসজীবনের অনিশ্চয়তার জ্বলন্ত উদাহরণ এটি। অনেক প্রবাসী এমন অসহায় অবস্থায় থাকতে পারে—প্রত্যেক প্রবাসীর ডেটাবেজ থাকা সম্ভব এবং জরুরি। কারণ তারা এই দেশের মানুষ এবং অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।’’
নড়িয়ার ইউএনও আবদুল কাইয়ুম বলেন, ‘‘পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্য যাচাই করার পর তা মালয়েশিয়া দূতাবাসে পাঠানো হয়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পৌঁছানোর পর দূতাবাস তাকে দেশে ফেরাতে উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি এখন পরিবারের সঙ্গে আছেন; ভবিষ্যতে তার যেকোনো সমস্যায় উপজেলা প্রশাসন পাশে থাকবে।’’
এই পুনর্মিলন পরিবারের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষার শেষ এবং স্থানীয় প্রশাসন, প্রবাসীসহ বিভিন্ন মানুষের সহযোগিতায় ঘটে যাওয়া মানবিক এক কাজ হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে।






