মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও হরমুজ প্রণালীর আংশিক বা পূর্ণ অবরোধের কারণে বিশ্ববাজারে সার—বিশেষত ইউরিয়া—দামের চরম ওঠানামা দেখা দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কৃষিপ্রধান দেশগুলোর ওপর; নিক্কেই এশিয়ার একটি প্রতিবেদনে পরিস্থিতিকে ‘খাদ্যসঙ্কটের সম্ভাব্য সূত্র’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্যের ভিত্তিতে বলা হচ্ছে, গত মার্চ মাসে ইউরিয়া সারের দাম 54% বেড়ে যায় এবং এপ্রিলে তা আরও 18% বাড়ে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন ইউরিয়ার দাম দাঁড়িয়েছে প্রায় 857 ডলার — যা গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। কাতার ও সৌদি আরবের মতো প্রধান সার উৎপাদক দেশগুলো থেকে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় এই সংকট তীব্র হচ্ছে। হ্রমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বা সীমিত চলাচলের কারণে সারবাহী জাহাজগুলো কৌশলগতভাবে জরুরি রুট থেকে শত্রুচক্র কেটে নেয়ায় চালান পৌঁছানো এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
ইউরিয়া হচ্ছে নাইট্রোজেনভিত্তিক প্রধান সার, এবং এশিয়ার অনেক দেশ—বিশেষত ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম—এই সিরিজের উপরে ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। মে-জুনে যখন ধান রোপণের কাজ তুঙ্গে থাকে, ঠিক তখন সার সংকট কৃষকদের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দেখা দিচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যদি নৌপথ অচল অবস্থায় থাকে এবং জুনের পরও সরবরাহ স্বাভাবিক না হয়, তাহলে সার সংকট একেবারে হিংস্র রূপ নিতে পারে।
সারের ব্যবহার কমে গেলে ধানের ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে—ফলশ্রুতিতে চালের উৎপাদন সংকুচিত হয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়তে পারে এবং খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ভারত, যা বিশ্বের শীর্ষ চাল রপ্তানিকারক, তাদের প্রয়োজনীয় সারের প্রায় 40% মধ্যপ্রাচ্য থেকে আনে; সেখানে সরবরাহ না চাইলে বিশ্বের চালসরবরাহে বিঘ্ন ঘটবে।
ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মত দেশগুলোও বাড়তি উৎপাদন খরচের কারণে ধান চাষ কমানোর কথা ভাবছে, যা অঞ্চলে চালের সরবরাহকে আরও সংকীর্ণ করতে পারে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) জানিয়েছে, জ্বালানি ও সার সংকটের ফলে কৃষি উপকরণের মোট ব্যয় 80% পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। ফলে ফিলিপাইনসহ খাদ্য আমদানিনির্ভর কয়েকটি দেশ ও আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে তীব্র খাদ্যসংকটের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
সেচ ও লজিস্টিক খরচ বৃদ্ধির কারণে কৃষি খরচ আরও বাড়বে, যা গৃহস্থালি বাজারেও চাহিদা ও মূল্য পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করে তুলবে। বিশেষজ্ঞরা অনুরোধ করছে—দ্রুত কূটনৈতিক ও লগিস্টিক সমাধান খুঁজে নেবার পাশাপাশি ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য জরুরি সহায়তা ও সারবণ্টন উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন, যাতে চলতি ফসল ও ভবিষ্যৎ ফলনে বড় পতন ঠেকানো যায়।
সাররক্ষার বিকল্প হিসেবে লোকালভাবে প্রাপ্ত সার-উপকরণ ব্যবহার, মাটির উর্বরতা উন্নয়ন ও সাশ্রয়ী সার ব্যবস্থাপনা জরুরি করণীয় হিসেবে সামনে এসেছে। তবে তা কেবল আংশিক সমাধান—দ্রুত ও স্থায়ী রূপে আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইন সচল করা ছাড়া বৃহৎ খাদ্যসঙ্কট এড়ানো কঠিন হবে।






