বেলজিয়ান হিপ-হপ শিল্পী স্ট্রমির ২০১৩ সালের জনপ্রিয় গান ‘পাপাউতে’ ২০২৬ সালে আবারও সামাজিক মাধ্যমে ভাসছে। টিকটক থেকে ইনস্টাগ্রাম রিল — সব প্ল্যাটফর্মে এই গানের তালে অসংখ্য ভিডিও দেখা যাচ্ছে। চমকপ্রদ ছন্দ ও নাচের আড়ালে গানটি যে শুধু বিনোদন নয়, এক গভীর ব্যক্তিগত বেদনার কণ্ঠস্বর বহন করে, সেটি ধীরে ধীরে নেটিজেনরাও অনুভব করছেন।
গানের শিরোনাম আসলে ফরাসি বাক্য ‘Papa, où t’es?’ থেকে নেওয়া, যার বাংলা অর্থ ‘বাবা, তুমি কোথায়?’. রচয়িতা ও সৌরভ-নামেই খ্যাত পল ভ্যান হেভেন—স্ট্রমি—এই প্রশ্নটিকে গান করে তুলেছেন যেন শৈশব থেকে মুছে না যাওয়া একটি আক্ষেপ। প্রতিটি পংক্তি থেকে বেজে ওঠে বাবাহীনতার যন্ত্রণা, সেই অনুকূলে জন্ম নেয় সাম্যহীনতার প্রতিধ্বনি।
এই ব্যক্তিগত কাহিনীর নেপথ্যে ১৯৯৪ সালের রোয়ান্ডা গণহত্যার নামকরণাত্মক ক্ষত রয়েছে। স্ট্রমির বাবা সেই সময় পরিবারের কাছে যেতে গিয়ে প্রাণ হারান। মাত্র নয় বছর বয়সে এমন ভয়ানক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল শিল্পীকে—একটি ছেঁড়া শৈশবের স্মৃতি যা গানের প্রতিটি সুরে ও কথায় ফিরে আসে।
স্ট্রমির বহু সাক্ষাৎকারে দেখা যায়, বাবা স্থপতি ছিলেন এবং বেলজিয়াম-রোয়ান্ডার মধ্যে কর্মসূত্রে ঘন ঘন যাতায়াত করতেন। কারণেই ছোট্ট স্ট্রমি বড়ো হলে বাবাকে কাছে পেতে পারেনি; জীবনে তিনি বাবাকে খুব কম—প্রায় বিশবার—ই দেখেছেন। গানের ভিডিওতেও শিল্পীকে দেখা যায় জ্যামিতিক নকশার কস্টিউমে বিপথগামী এক অন্তঃস্থ মানুষ হিসেবে, যেন জীবনের অভাবে গড়ে ওঠা শূন্যতাই তার দেহে ঢিলে পড়ে আছে। ওই কল্পনাত্মক শৈল্পিক দৃশ্যই ‘বাবা থাকা আর না থাকার’ সেই অদ্ভুত ফাঁকটিকে তুলে ধরেছে।
স্ট্রমির আগে প্রকাশিত হিট গান ‘Alors on danse’ ২০০৯ সালে বহু দেশে সঙ্গীত চার্টে শীর্ষে উঠে এবং তাঁর প্রথম অ্যালবাম ‘Cheese’ বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করে। আর ‘পাপাউতে’র এই পুনর্জাগরণ প্রমাণ করল—ভালো শিল্পকর্ম সময়ের বাঁধা পাড়ি দেয়। আজকার সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীরাও এই গানের তালে শুধুই বিনোদন খুঁজছেন না; অনেকেই নিজেদের ব্যক্তিগত বেদনা, নস্টালজিয়া ও চাওয়ার প্রকাশ হিসেবে গানটি ব্যবহার করছেন।
এক যুগ পেরিয়ে ‘পাপাউতে’ যখন আবার ভাইরাল হয়েছে, তখন ফেলে দেয় একটি প্রশ্নও—কীভাবে একটি গান একইসঙ্গে মানুষকে নাচতে এবং ভাবতে বাধ্য করে? স্ট্রমির ক্ষেত্রে সেটা সম্ভব হয়েছে কারণ তার শিল্পে ব্যক্তিগত ক্ষত ও সামাজিক বাস্তবতার সংমিশ্রণ মেলে। বেদনার এই গানটি আজও সারা বিশ্বের এমন অনেক কণ্ঠে অনুরণিত হচ্ছে, যারা বাবাহীনতার শূন্যতাকে নিজেদের মতো করে বর্ণনা করে। সব মিলিয়ে ‘পাপাউতে’ আবারও স্মরণ করালো কেন স্ট্রমিকে সমসাময়িক বিশ্বের উল্লেখযোগ্য ও শক্তিশালী কণ্ঠদের মধ্যে গণ্য করা হয়।






