বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি গভীর বিতর্কের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর যে সরকার গঠিত হয়, তার নেতৃত্বদানকারী কেন্দ্রবিন্দু ছিল জাতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তবে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই সরকারের ভেতরও এক ধরনের দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা চালু ছিল, যাকে অনেকেই অন্য এক সরকার বলে অভিহিত করছেন। এই বিষয়টি এখন দেশের মতো আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক আলোচনায় উঠে এসেছে।
বিশেষ করে, সম্প্রতি এক বেসরকারি টেলিভিশনের সাক্ষাৎকারে সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন এই বিষয়টি স্পষ্ট করে বলেছেন, অর্থাৎ এতদিনে দেশবাসী বুঝতে পেরেছেন যে, ঐ সরকারে এক ধরনের গোপন দল বা ‘কিচেন কেবিনেট’ ছিল, যারা মূল সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছিলেন। এই ছোট দলের সদস্যরা মূল সরকারপ্রধানের কার্যালয় থেকে মূল সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতেন। তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য তারা প্রতি সপ্তাহে সভা করতেন এবং বোঝা যায়, এর মাধ্যমে ‘ডিপ স্টেট’ বা গভীর রাষ্ট্রের হুমকি কাজ করছিল।
তৌহিদ হোসেন আরও দাবি করেন, তিনি তিনবার পদত্যাগের চেষ্টা করেছিলেন, কারণ তার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টারা প্রভাব বিস্তার করতেন। তিনি এমনকি, তার কাজের সময় একটি পোস্টের বিরোধিতায় তিনি সত্যতা প্রকাশ করেছিলেন, যেখানে দেখা যায়, কিছু উপদেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি বাতিল বা পরিপ্রেক্ষিত পরিবর্তনের কাজও করছিলেন। বিশেষ করে, তিনি জানিয়ে দেন যে, ভারতীয় সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর বাইরে ছিল। কয়েকটি চুক্তি এমন ছিল যেগুলোর স্বাক্ষরও হয়নি। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধেও অসংখ্য ভিন্নমত ছিল।
এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো কিচেন কেবিনেটের ধারণা ইতিমধ্যে বহু বছর ধরেই বাংলাদেশে থাকছে। সরকারি, রাজনৈতিক এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এটি দেখা যায়। এর মূল অর্থ হলো, কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বা উপদেষ্টা একটি প্রতিষ্ঠান বা সরকারের নিয়ন্ত্রণ হাতে নেন এবং অন্যান্য অংশগ্রহণকারী সাধারণত তাদের অধীনে রয়েছেন। এই ধরনের নিয়ন্ত্রণ গণতন্ত্রের সঙ্গে পুরোপুরি বিপরীত। গণতন্ত্রে সবার অংশগ্রহণ থাকে, কিন্তু অলিগার্কি বা অভিজাততন্ত্রের মধ্যে তা থাকে না। এই ধরনের শাসনে, ক্ষমতা একটি ছোট গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয় এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ কমে যায়, যা দেশের সার্বিক কল্যাণের জন্য ক্ষতিকর।
বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হলো তার সাধারণ গ্রহণযোগ্যতা ও স্বচ্ছতা। কিন্তু, বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ইউনূসের ঘনিষ্ঠ কিছু উপদেষ্টার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হয়ে উঠছিল, যা সরকারের ভেতর মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব সৃষ্টি করছে। এই পরিস্থিতিতে, সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তৌহিদ হোসেন বলেন, বড় সিদ্ধান্তগুলো মূলত কেবিনেটের বাইরেই হতো। তিনি জানান, প্রতি মঙ্গলবার তারা বসতেন, এবং তখনই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। তবে, তিনি এ বিষয়েও পরিষ্কার করে বলেছেন যে, তিনি এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ জানতেন না।
তবে, এই ‘কিচেন কেবিনেট’ ও ডিপ স্টেটের বিষয়টি নতুন নয়। এর আগে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সাবেক উপদেষ্টারা এই ধরনের কথাবার্তা প্রকাশ করেছেন। যেমন, এক উপদেষ্টা বলেছিলেন, গভীর রাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে তাদের ক্ষমতায় রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দেশীয় রাজনীতিতে এ ধরনের গুঞ্জন ও অভিযোগ নতুন কিছু নয়।
বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক দলের নেতারা মনে করেন, এই ধরনের গোপন গোষ্ঠীর কার্যক্রম দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠায় বড় ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। বেশ কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, এই প্রভাবশালী গোষ্ঠী দেশের সামনে বড় বিপদ নিয়ে আসছে, যেখানে সিদ্ধান্তগুলো মূলত কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মহলেও এই বিষয়টি গভীরভাবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এত গোপনীয়তা সাধারণ নাগরিকের জন্য অস্বস্তিকর এবং দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। বাংলাদেশের ইতিহাসে মাঝেমধ্যে এমন অভিজ্ঞতা দেখা গেছে, যেখানে একদল প্রভাবশালী গোষ্ঠী দেশের বৃহত্তর স্বার্থে ক্ষমতা চালিয়েছে। অতীতের মতোই, এখনো সেই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বলাই যায়, মীর জাফরের মতো কিছু দর্পী ব্যক্তির বিচারের জন্য জনগণের ‘আদালত’ অপেক্ষা করছে। কারণ, আইনী ব্যবস্থা সব সময় তাদের শাস্তি দিতে পারবে না; তবে অধিকতর অনুসন্ধান ও তদন্তের মাধ্যমে তাদের প্রকৃত দোষ নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
সাংবাদিক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এখন সময় এসেছে দেশের বোদ্ধারা একত্রিত হয়ে এই গোপন গোষ্ঠীর কার্যক্রমের সত্যতা তদন্ত এবং প্রকাশের জন্য কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। এর মাধ্যমে জানা যাবে, দেশবিরোধী বা স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কারা যুক্ত। দেশের গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এই বিষয়ে নীরবতা যে কোনোভাবেই অপ্রত্যাশিত, তাই সবার সম্মিলিত উদ্যোগে এই অপছন্দনীয় পরিস্থিতি থেকে মুক্তি প্রয়োজন।






