দীর্ঘস্থায়ী যানজট, শব্দদূষণ ও বিশৃঙ্খলা কমাতে রাজধানী ঢাকার ভেতর থেকে কয়েকটি দূরপাল্লা বাস টার্মিনাল ধাপে ধাপে সরিয়ে বাইরে স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সায়েদাবাদ, গুলিস্তান ও মহাখালী এই তিনটি টার্মিনাল রাজধানীর অভ্যন্তর থেকে সরিয়ে উপযুক্ত প্রান্তিক স্থানে রাখা হবে — এটাই বৈঠকে নেওয়া অন্তিম সিদ্ধান্ত।
সোমবার সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জনপ্রশাসন সভাকক্ষে ‘যানজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন’ বিষয়ক তৃতীয় দফার উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেই প্রধানমন্ত্রী এই নির্দেশ দেন। বৈঠকে ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থা সংস্কার ও নগর পরিবহন আধুনিকায়ন নিয়ে গভীর আলোচনা হয়। সভার পরে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের প্রশাসক সাংবাদিকদের ওই মেগা পরিকল্পনার খবর নিশ্চিত করেছেন।
বৈঠকে জোর দেওয়া হয়েছে যে, ঢাকার প্রবেশপথে অবস্থানরত এসব টার্মিনালই দীর্ঘদিন ধরে অভ্যন্তরীণ যানজটের মূল কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার দূরপাল্লার বাস সায়েদাবাদ, গুলিস্তান ও মহাখালী হয়ে ঢাকায় ঢুকে পড়ে এবং আবার বের হয়—ফলশ্রুতিতে এই পথগুলোতে সারাবেলা যানজট লেগেই থাকে। এই সমস্যা কেবল সময় নষ্ট করছে না, বরং দেশের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে ধারণা করা হয়েছে।
পরিকল্পিত পুনর্বাসন ও সম্ভাব্য স্থানসমূহ
সরিয়ে নেওয়া টার্মিনালগুলো একসাথে এক দিনে সরানো সম্ভব নয়; তাই ধাপে ধাপে ঢাকার বাইরে চারপাশের উপযুক্ত প্রান্তিক এলাকায় আধুনিক টার্মিনাল নির্মান করে সেখানে পুনর্বাসন করা হবে। সম্ভাব্য অবস্থান হিসেবে সভায় যে স্থানগুলো আলোচনায় এসেছে তার মধ্যে রয়েছে:
– কাঞ্চপুর (উত্তর ও দক্ষিণ) — সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের বাসের জন্য
– কেরানীগঞ্জ (বাউরিয়া) — খুলনা ও বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের বাসের জন্য
– সাভার (হেমায়েতপুর বা আমিনবাজার) — রাজশাহী ও রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের বাসের জন্য
– গাজীপুর বা বাউলিয়া সংলগ্ন এলাকা — ময়মনসিংহ বিভাগের বাসের জন্য
প্রান্তিক এসব টার্মিনাল কাজ করলে দূরপাল্লার বাসগুলো ঢাকার মূল সীমানার বাইরে থেকেই যাত্রী নামিয়ে আবার রওনা দেবার ব্যবস্থা থাকবে। হিসাব অনুযায়ী শহরের ভিতরের রাস্তায় দূরপাল্লার বাসের চাপ প্রায় ৭০–৮০ শতাংশ কমে আসবে।
চ্যালেঞ্জ ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি
বৈঠকে বাস্তবায়নের সামনে থাকা প্রধান প্রতিবন্ধকতাগুলোও তুলে ধরা হয়—বৃহৎ পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ, টার্মিনাল নির্মাণের জন্য বহুবিধ অবকাঠামো নির্মাণ, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমন্বয়, এবং যাত্রীদের জন্য সাশ্রয়ী ও সুবিধাজনক লিংক ট্রান্সপোর্ট নিশ্চিত করা। সরকারের পাশাপাশি রাজনীতিবিদ, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, রাজউক, বিআরটিএ, বিআরটিসি ও নগর পরিকল্পনাবিদদের সমন্বিত কাজ প্রয়োজন হবে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও বুয়েটের বিশেষজ্ঞরা সরকারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন যে, কেবল টার্মিনাল সরালেই যানজট কাটবে না—এই উদ্যোগ সফল করতে সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা দ্রুত গড়ে তুলতে হবে। তারা পরামর্শ দিয়েছেন টার্মিনালগুলোর সাথে মেট্রোরেল, বাস র্যাপিড ট্রানজিট বা বিশেষ চক্রাকার বাস সার্ভিসের যোগসাজশ রাখতে হবে এবং অভ্যন্তরীণ লোকাল বাস রুটগুলো রেশনালাইজ করে ফিটনেস ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে।
পরিকল্পনার লক্ষ্য ও প্রত্যাশা
সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে হলে শহরের ভেতর দূরপাল্লার বাসের প্রবেশ সীমিত করা অপরিহার্য। যদি এই প্রাথমিক কাঠামো নিরপেক্ষ, সমন্বিত ও দুর্নীতিমুক্তভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে রাজধানীবাসী আগামীতে যানজটমুক্ত, দূষণ কমানো ও আধুনিক পরিবহনযুক্ত এক নগরী পাবে—এটাই সরকারের লক্ষ্য ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।
পরবর্তী ধাপে প্রশাসন নির্দিষ্ট সময়সীমা ও বাস্তবায়ন রোডম্যাপ প্রস্তুত করবে এবং মন্ত্রণালয়গুলোকে দ্রুত কাজ শুরু করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।






