আষাঢ়ের চেনা বৃষ্টির মাত্রা মানেই এখন বাংলাদেশের দুটি প্রধান মহানগরী ঢাকা ও চট্টগ্রামে এক অচেনা আতঙ্কের সৃষ্টি। আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা আর গুড়গুড় রব শুনলেই বুক কাঁপে লাখো নগরবাসীর। আধা ঘণ্টার বৃষ্টিতে সেখানে তৈরি হয় পানির ভূ-রূপক—নগর-নদী। অলিতে গলিতে জমে হাঁটু থেকে কোমর জল, কোথাও কোথাও তা চ paddleিবে বুকের উচ্চতাও ছাড়িয়ে যায়। নোংরা ও দূষিত পানির ঝড়ে সাধারণ মানুষকে নিদ্রাহীন হতে হয়। বছর বছর যায়, দশক পার হয়, কিন্তু বাস্তবতা পাল্টায় না। রাজনৈতিক নেতা ও সিটি মেয়ররা বদলালেও জলাবদ্ধতার সেই পুরোনো সমস্যা অব্যাহত। নির্বাচনী ইশতেহারে জলাবদ্ধতা মুক্তির স্বপ্ন জোড়াজোড়ি করে লেখা হলেও বাস্তবে কোনও কার্যকরন হয়নি। ড্রেনের চওড়া করণ, খাল উদ্ধার ও খননের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও কোন ফলাফল হয়নি। রাজধানী ঢাকা ও বাণিজ্যিক চট্টগ্রাম বর্ষায় জলমগ্ন হয়ে পড়ে, আধুনিকতার দাবিদার নগরীর গালিচা মুখোশ অদৃশ্য হয়ে যায় সেই পুরোনো জলজটের কারণে, জনप्रतিনিধির প্রতিশ্রুতির নোংরা পানিতে ডোবা হয়ে থাকে নির্মাতা অক্ষমতা। কিন্তু এই প্রবল বর্ষাকালের ভোগান্তি শুধুমাত্র দুইটি শহরেই সীমাবদ্ধ নয়; তা রূপ নিয়ে চলে গেছে এক জাতীয় বিপর্যয়ে। ভারি বর্ষা, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসের ফলে দক্ষিণ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত জেলায় বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এ পর্যন্ত বন্যা ও পানিবন্দি হয়ে প্রাণ গেছে কমপক্ষে ৫১ জনের, আহত হয়েছে আরও ৩৯ জন। ঢাকা ও চট্টগ্রাম ক্ষেত্রেও বর্ষার সাময়িক বৃষ্টি তাদের জলাবদ্ধ করতে যথেষ্ট; অন্যদিকে দেশের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রশ্ন, কেন আমাদের শহরগুলো এমন জলপ্লাবের মধ্যে পড়ে থাকে, তার স্থায়ী সমাধান এখনও আসেনি। গ্রামীণ এলাকা, বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের চরাঞ্চল ও পাহাড়ি এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর। বন্যা এবং পাহাড়ধসের কারণে বহু মানুষ জীবন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে গেছে, সড়ক-সেতু ধসে পড়েছে, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত, শহরের কেন্দ্রশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জলাবদ্ধতা সৃষ্টির জন্য একান্ত ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার জলাবদ্ধতার মূল কারণ হলো অপ্রশস্ত নগর জোড়াতালি নগরায়ণ যার ফলে শহরের প্রাকৃতিক জলাধার ও খাল ভরাট হয়েছে। অপরিকল্পিত নগর উন্নয়ন, খাল ও জলাশয় ভরাট আর পাকা রাস্তার আধিক্য জল নিষ্কাশনের প্রতিটি উপায়কে বাধাগ্রস্ত করেছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থা ত্রুটিপূর্ণ— সময়ে সময়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন না হওয়া ও পলিথিন ও ময়লার জমা হয়ে পানিসহ যথাযথ নিষ্কাশন ব্যাহত। আবার, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে কার্যক্রমে গরমিল হয়। নতুন পরিকল্পনায় ঢাকার জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে এক নজরদারি ও প্রযুক্তির ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছে—‘স্মার্ট ড্রেনেজ লাইন’, খাল পুনরুজ্জীবন, আধুনিক আউটলেট ব্যবস্থা এবং হাই-টেক পাম্পিং স্টেশন। ঢাকার দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনের যৌথ উদ্যোগে এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলীরা আশাবাদী, যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ সমাপ্ত হয়, তাহলে জলাবদ্ধতার স্থায়ী ও টেকসই সমাধান সম্ভব হবে। তবে অচিরেই এক সঙ্গে কাজ না হলে পরিস্থিতির উন্নতি খুব বেশি আশা করতে পারছেন না, বিশেষ করে এ ধরনের প্রকল্পে সময় ও সমন্বয়ের গুরুত্ব অপরিহার্য। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম শহর ও আশপাশের এলাকাগুলো এই জলবিধ্বংসী পরিস্থিতির শিকার—প্রচুর উন্নয়ন প্রকল্পের পরও জলাধার ও খাল ভরাটের কারণে বর্ষার সময় জলজট নিরসন কঠিন হয়ে পড়েছে। পাহাড় কাটা, বালুর আস্তরণ আর খাল-মুখে রেগুলেটর গেটের অপ্রতুল ব্যবস্থাপনা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেক অভিযোগ, কোটি কোটি টাকা ব্যয় সত্ত্বেও প্রকল্পের কার্যকারিতা কম। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জলবন্দি পরিস্থিতিও ভয়াবহ—পাহাড়ি ঢল ও এল নিনো প্রভাবের কারণে অল্প কয়েক দিনের মধ্যে ব্যাপক বৃষ্টিপাত ও বন্যা দেখা দিয়ে অসহনীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। নিহতের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, লাখো মানুষ পানিবন্দি ও দুর্গত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। যোগাযোগ সচল, বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ও পানির অভাব, এসবের মধ্যে মানবিক বিপর্যয় শুরু হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া মানুষজনের জন্য কোনও শান্তি নেই—খাদ্য, পানি ও ওষুধের সংকট আরও তীব্র। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালাচ্ছে, তবে চাহিদা অনুযায়ী ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আবহাওয়া অধিদপ্তর সতর্ক করে দিয়েছে, আগামী দুই দিন ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে ঢাকাসহ দেশের বেশ কয়েকটি অঞ্চলে পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। জনমনে ঘোর আতঙ্ক আর ভবিষ্যৎ নিয়ে গুঞ্জন বলছে, এই জলাবদ্ধতার সমস্যা একদিনের নয়, এর স্থায়ী সমাধান এখনই জরুরি—যেখানে পরিকল্পনা, প্রযুক্তি ও সমন্বয়ের অভাব থাকবেনা, সেই পথেই এগিয়ে যেতে হবে বাংলাদেশকে।






