দীর্ঘ দুই বছরের বেশি সময় বন্ধ থাকার পর অবশেষে আবারও খুলে যাচ্ছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। তবে এবার আগের মতো সহজ এবং অনিয়মের সুযোগ রেখেই নয়, বরং সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, জবাবদিহি নিশ্চিত এবং নিরাপদ প্রক্রিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের সরকার এই নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে কর্মীদের জন্য একটি নিরাপদ পথ তৈরি করছে, যেখানে অভিবাসনের খরচ কমানোর পাশাপাশি দক্ষতা ও ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন কর্মী তৈরি করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নতুন নিয়মে বাংলাদেশ থেকে ১০ হাজার কর্মী শূন্য খরচে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর জন্য নীতিগর্ভভাবে একমত হয়েছে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ। এর অর্থ হলো, এখন থেকে কর্মীদের বিমানভাড়া ও অন্যান্য অভিবাসন সংক্রান্ত ব্যয়ভার বাংলাদেশ সরকার বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকেই নিতে হবে, যা আগে ছিল না। প্রথম পর্যায়ে এই কর্মীদের পাঠানোর দায়ভার বহন করবে বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল) যা বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটের মাধ্যমে কার্যকর হবে।
এছাড়া, শুধু বিদেশে যাওয়ার জন্যই নয়, বরং দক্ষ কর্মী তৈরি করেও এই প্রক্রিয়া চালু হচ্ছে। সরকারের পরিকল্পনায় আছে, কর্মীদের শুধু ভাষা ও কাজের দক্ষতা প্রশিক্ষণই নয়, তাদের করে তুলতে হবে দক্ষ, যোগ্য ও প্রশিক্ষিত, যেন তারা চাকরির জন্য বিদেশে যেতে পারেন। প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী গত মঙ্গলবার বলেন, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো, কর্মীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতির মাধ্যমে তাদের অভিবাসন ঝুঁকি কমানো। এর ফলে, বিদেশে কাজের জন্য অপ্রয়োজনীয় অভিযোগ বা জটিলতা এবারের উদ্যোগে কমবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শুরুতেই ১০ হাজার কর্মীকে শূন্য খরচে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর এই সিদ্ধান্ত বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে দেখা গেছে, বাংলাদেশি কর্মীরা নানা ধরনের অতিরিক্ত ব্যয় বহন করেছেন, যা অনেক সময় তাদের জন্য বিরম্বনা সৃষ্টি করেছে। এই অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে, সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেল প্রথমবারের মতো এই দায়িত্ব গ্রহণ করছে। এর মাধ্যমে, নিয়োগপ্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতা মূলক ও দুর্নীতির সম্ভাবনা কমানোর চেষ্টা চালানো হবে। তবে, এ বিষয়ে 아직 কিছু প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়নি। আবেদন, নিয়োগ, কোম্পানি নির্বাচন, ও যাত্রার তারিখ নিয়ে বিস্তারিত কার্যক্রম শিগগিরিই প্রকাশ করা হবে।
এদিকে, মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের জন্য ২৫টি প্রধান রিক্রুটিং এজেন্সি সরাসরি নির্বাচন করা হয়েছে। এর সাথে আরো ৩১২টি এজেন্সি অ্যাসোসিয়েট হিসেবে কাজ করতে পারবেন। মোট ৩৩৮টি প্রতিষ্ঠান দিয়ে এই কর্মী প্রেরণের কার্যক্রম চালানো হবে। এই নতুন ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো, কিছু নির্দিষ্ট এজেন্সির ওপর বেশি নির্ভরতা কমানো, নিয়োগের স্বচ্ছতা বাড়ানো ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করা।
মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ, পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর যৌথ চেষ্টায় এই নিয়োগ প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখা হয়েছে। ২০২২ সালে শ্রমবাজারটি পুনরায় খোলার পর থেকে মে ২০২৪ পর্যন্ত প্রায় চার লাখ পঞ্চাশ হাজার বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় গেছেন, এবং বর্তমানে সেখানে ৮ লাখের বেশি বাংলাদেশি কাজ করছেন। তবে, আগের সময়কার নিয়োগে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, যেমন অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, সিন্ডিকেট ও হয়রানি। এর ফলে, ২০২৪ সালের ৩১ মে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশিদের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়।
তাই, এখন মূল লক্ষ্য হলো—আবারো শ্রমবাজার খুলে দিয়ে কিভাবে কর্মীরা কম খরচে, নিরাপদে এবং প্রকৃত চাকরির নিশ্চয়তা নিয়ে যেতে পারেন, সেটাই বড় পরীক্ষা। অতীতে দেখা গেছে, প্রকৃত অভিবাসন ব্যয় সাধারণত নির্ধারিত হয়তো অনেক বেশি ছিল, অনেক কর্মীর ক্ষেত্রে সেই ব্যয় কয়েক লাখ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এ ঘটনার সামাধানে, এবারের শূন্য খরচের মডেল সফল হলে, ভবিষ্যতে অন্যান্য শ্রমবাজারেও এই আকাশচুম্বک অভিবাসন ব্যয়ভিত্তিক প্রক্রিয়া চালু হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে।
অতিসিদ্ধ, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত চালুর জন্য দেশটি বিদ্যমান তালিকা থেকে বিতর্কিত ও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা ১৬টি মেডিকেল সেন্টার বাদ দিয়ে নতুন কর্মসূচি শুরু করতে চায়। পরবর্তী সময়ে মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য, মানবসম্পদ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টভাবে বাংলাদেশে এসে এসব কেন্দ্র পরিদর্শন করবে। এরপর নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ নিয়োগের জন্য নতুন তালিকা তৈরি করা হবে।
এ ছাড়াও, নিয়োগ প্রক্রিয়া আরো আধুনিক, স্বচ্ছ ও ডিজিটাল করার জন্য আলোচনা চলছে। মন্ত্রিসভা একসাথে এক দফা উদ্যোগের আওতায়, এক স্থান থেকে সব সেবা পাওয়ার একটি ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু করার প্রস্তাবও উঠেছে। এর মাধ্যমে নিয়োগসংক্রান্ত তথ্য ও প্রসেস সহজেই অ্যাকসেস করা যাবে, দালালপ্রথা কমে আসবে।
সরকার বিদ্রূপ বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ও গুজব থেকে সতর্ক থাকার জন্য প্রবাসী দরখাস্তীদের জন্য বিশেষ আহ্বান জানায়, যাতে তারা নিরপেক্ষ ও প্রামাণিক তথ্যের বাইরে গিয়ে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন বা মেডিকেল পরীক্ষা বা পাসপোর্ট জমা না দেয়। একই সঙ্গে, দালাল, মধ্যস্বত্বভোগী বা প্রতিষ্ঠানের নাম করে প্রতারকদের বিষয়ে সচেতন থাকতে বলা হয়েছে।
বোয়েসেল নিজস্ব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নির্ভরশীলভাবে বিদেশে চাকরি খুঁজে নেওয়ার সুবিধা দেয়। এই উদ্যোগে কর্মী, নিয়োগকর্তা ও সরকার সব পক্ষের জন্য সুবিধাজনক, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী অভিবাসনপ্রক্রিয়া সম্ভব।
দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পরে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারটি আবার চালুর উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্য বড় সূচনালগ্ন। প্রথম ধাপে ১০,০০০ কর্মী বিনা খরচে যাওয়ার সুযোগ এই উদ্যোগকে আরও গুরুত্ববহ করে তুলেছে। তবে, এই উদ্যোগের সফলতা অর্জনের জন্য এটি যথেষ্ট নয়; কেননা, প্রকৃত কাজের নিশ্চয়তা, ন্যায্য বেতন, নিরাপদ শ্রমপরিবেশ, আবাসন, চিকিৎসা, ও নিয়মিত বেতন-ভাতা নিশ্চিত করাই গুরুত্বপূর্ণ।
অতীতের ত্রুটিগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে, স্বচ্ছ নিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়ন, সরকারি তদারকি ও দালালমুক্ত প্রক্রিয়া নিশ্চিত হলে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশে হাজারো পরিবারের জন্য এক নতুন ধারার কর্মসংস্থান ও আয়ের পথ হয়ে উঠবে।






