বাংলাদেশ–মিয়ানমার সীমান্ত বাণিজ্যের মুখ্য প্রবেশপথ টেকনাফ স্থলবন্দর প্রায় এক বছর ধরে কার্যত বন্ধ ছিল। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও সীমান্ত নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে দীর্ঘদিন আমদানি-রপ্তানি বন্ধ থাকায় বন্দর পুনরায় সচল করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান সোমবার টেকনাফ স্থলবন্দর পরিদর্শন করেন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার সদর ইউনিয়নের কেরুনতলী এলাকায় নাফ নদীর তীরে অবস্থিত বন্দরে পৌঁছে তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তর, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বন্দর সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরিদর্শনকালে তিনি গুদামঘর, অবকাঠামো ও সামগ্রিক কার্যক্রম খতিয়ে দেখেন।
পরিদর্শন শেষে প্রতিমন্ত্রী জানান, স্থলবন্দর পুনরায় খুলতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও সমন্বয় কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ব্যবসায়ী, বিজিবি, কোস্টগার্ড, সিএন্ডএফ এজেন্ট, কাস্টমস ও এনবিআরসহ সব সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে মিলিতভাবে কাজ করা হচ্ছে। জনগণের চাহিদা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় দ্রুত বন্দর সচল করা সরকারের অগ্রাধিকার বলে তিনি জানান। এছাড়া বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে সীমান্ত বাণিজ্য স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।
প্রতিমন্ত্রী রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকে বড় একটি ঝুঁকিপূর্ণ বিষয় মনে করেন এবং সংকেত দেন যে বন্দরকেন্দ্রিক কার্যক্রমে উচ্চমাত্রার সতর্কতা অবলম্বন করা হবে। তিনি বলেন, পোর্ট অপারেটর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে স্পষ্ট নির্দেশ দেয়া হয়েছে—অবস্থা যাই হোক রোহিঙ্গাদের বন্দর সংক্রান্ত কাজে সম্পৃক্ত হওয়া যাবে না। এখানে কাজ করতে হলে অবশ্যই বাংলাদেশি বৈধ নাগরিক হতে হবে এবং স্থানীয় প্রশাসনের প্রত্যয়নপত্র বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অনুপ্রবেশ বা সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ মিললে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) মুহাম্মদ মানজারুল মান্নান বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে বন্দর খোলা থাকলেও নিরাপত্তাজনিত কারণে এখানে আড়াই বছরের মতো সীমাবদ্ধতা ছিল। এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করে ধাপে ধাপে পণ্য আমদানি-রপ্তানি সচল করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
বন্দর দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় অর্থনীতিতে ক্ষতি হয়েছে। গত অর্থবছরে সরকার প্রায় ৫০০ কোটি টাকার রাজস্ব হারিয়েছে বলেই দাবি করা হচ্ছে। স্থানীয় বাজারে নিত্যপণ্যের সরবরাহে বিঘœ ঘটেছে এবং হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। কাস্টমসের তথ্য বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে টেকনাফ স্থলবন্দর থেকে প্রায় ৬৪০ কোটি টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় ৮০৪ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছিল; তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা মাত্র ১৩০ কোটিতে নামছে।
টেকনাফ স্থলবন্দর সি অ্যান্ড এফ অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি ওমর ফারুক বলেন, দ্রুত বন্দর চালুর বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। এক বছরের লোকসান কাটিয়ে ওঠার আশায় ব্যবসায়ীরা অপেক্ষা করছেন।
উল্লেখ্য, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সঙ্ঘাত এবং আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ এলাকাসহ সীমান্ত অঞ্চলে অনিশ্চয়তার কারণে বাণিজ্যে প্রভাব পরেছে। গত বছরের এপ্রিল মাসে একটি পণ্যবাহী জাহাজ থেকে চাঁদা দাবির ঘটনায় বাণিজ্য কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া বন্দরকে বিশাল চ্যালেঞ্জে ফেলেছিল।
সরকার নিরাপত্তা ও বাণিজ্যের মধ্যকার ভারসাম্য বজায় রেখে দ্রুততম সময়ে বন্দর পুনরায় খোলার চেষ্টা করছে, তবে সেখানকার আশঙ্কাগুলো কাটিয়ে ওঠাই প্রধান চ্যালেঞ্জ বলেই সংশ্লিষ্টরা জানান।






