আর্লিং হালান্ডের সামনে দাঁড়ানো—এটাই নরওয়ের স্ট্রাইকারকে থামানোর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নকআউট পর্বের ম্যাচে ঠিক সেই চ্যালেঞ্জ নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে আইভরি কোস্ট। আফ্রিকান দলটি জানে, হালান্ডকে একটু জায়গা দিলেই তিনি একাই ম্যাচের ধারণা বদলে দিতে পারেন। তাই দলের কোচ বিশেষ রক্ষণাত্মক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন, যাতে হালান্ডকে বলের জোগান থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয় এবং তার উপর কড়া প্রেস বসিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়া যায়।
ডালাসে বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এ প্রতিপক্ষ নরওয়ের মুখোমুখি হওয়ার ম্যাচটি কেবল খেলাই নয়—এটি আন্তর্জাতিক ফুটবলের দুই ভিন্ন ইঙ্গিতের সম্মুখীন এক মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। একদিকে আছে আফ্রিকার উগ্র গতি ও আবেগ, অন্যদিকে উত্তর ইউরোপীয় ধৈর্য্য ও দক্ষতা। দুই দল আগে কখনও মুখোমুখি হয়নি, তাই ইতিহাস বা পারস্পরিক রেকর্ডের চাপ ছাড়াই সরাসরি এই নকআউট যুদ্ধে নামবে তারা।
আইভরি কোস্ট এবার বিশ্বকাপে নতুন করে নিজেদের পরিচয় গড়তে এসেছে। ২০০৬, ২০১০ ও ২০১৪-এ সুযোগ থাকলেও তারা নকআউটে যেতে পারেনি; এবার নতুন প্রজন্ম সেই স্বপ্ন পূর্ণ করায় সক্ষম হয়েছে। গ্রুপ পর্বে ইকুয়েডরকে ১–০তে হারিয়ে শুরু, জার্মানির কাছে ২–১ ব্যবধানে পরাজয়ের পর কুরাসাওকে ২–০ করে শেষ ম্যাচে জয় পেয়ে নকআউটে উঠেছে তারা। নিকোলাস পেপের জোড়া গোল, আমাদ দিয়ালোর দৌড়ঝাপ আর আঞ্জ–ইওয়ান বনি-র বুদ্ধিদীপ্ত উপস্থিতি দিয়ে দল এখন একটি সুষম ও দলগত শক্তি হিসেবে পরিচিত।
নরওয়ে দীর্ঘ ২৮ বছরের বিরতির পর বড় টুর্নামেন্টে ফিরে এসেছে পুরনো ক্ষুধা নিয়ে। গ্রুপ পর্বে তাদের শুরুটা ঝড়ো—ইরাককে ৪–১ ও সেনেগালকে ৩–২ করে জয়। ফলে শেষ গ্রুপ ম্যাচে কোচ স্টালে সোলবাক্কেন প্রধান খেলোয়াড়দের বিশ্রাম দিয়ে ফ্রান্সের বিপক্ষে বেশ কয়েকজন নিয়মিত খেলোয়াড়কে বাঁচিয়েছিলেন; সেই ম্যাচে তারা ১–৪ হেরেছে। নরওয়ের আক্রমণভাগ এখন পর্যন্ত আট গোল করেছে, কিন্তু সাত গোল হজম করে রক্ষণভাগ কিছুটা অনিরাপদ। এই রক্ষণগত দুর্বলতাই আইভরি কোস্টের বড় আশা।
তবে সবকিছুই হালান্ডকে কেন্দ্র করে। এই নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকার প্রথম দুই ম্যাচেই চার গোল করেছেন এবং পরের রাউন্ডে পুরো টিকিট কাটা নিশ্চিত করতে দলে বিশ্রাম দিয়ে রাখা হয়েছিল যাতে তিনি পুরোপুরি সতেজ থাকেন। ডালাসে তিনি ফিরছেন পুরো প্রস্তুত অবস্থায়—এটাই নরওয়ের বড় সুবিধা।
আইভরি কোস্টের কোচ এমের্স ফায়ে জানেন হালান্ডকে ঘিরে কৌশলই ম্যাচের চাবিকাঠি। রক্ষায় দলের যুব প্রতিভা ওসমান দিয়োমান্দের উপর অনেকটা আশা রাখা হয়েছে—তার কাজ হবে হালান্ডের গতিকে সীমিত করা এবং তার কাছ থেকে বল কেটে নেওয়া। তবে ফায়ে কেবল পাহারা বেঁধে বসে থাকার রাজি নন; তিনি চান আক্রমণে দল শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক রেখেছে এবং প্রতিপক্ষকে চাপের মধ্যে রাখবে। দলের অন্যতম শক্তি হল একাধিক গোলদাতা; নিকোলাস পেপে, ইয়ান দিয়োমান্দে ও আঞ্জে-ইওয়ান বনি-র মতো খেলোয়াড়রা যে কোনও মুহুর্তে বিপদ সৃষ্টি করতে পারে।
দুই দলের কোচই ম্যানেজমেন্টে পরিষ্কার বদল করেছেন—নরওয়ে তাদের প্রধান তারকা সতেজ রাখতে খেলোয়াড়দের বিশ্রাম দিয়েছেন, আর আইভরি কোস্ট কেউ একক তারকার ওপর নির্ভর করছে না; তাতে দলটি বেশি ভারসাম্যপূর্ণ মনে হচ্ছে। ডালাসের গরম নিয়ে কিছু শঙ্কা থাকলেও ম্যাচ হবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আধুনিক স্টেডিয়ামে, তাই আবহাওয়াকে বড় প্রায়োগিক বাধা যে হবে না বলে মনে করা হচ্ছে।
শেষ হাসি কার—হালান্ডের একক ঝড় কি নরওয়েকে অগ্রসর করবে, নাকি আইভরি কোস্টের সংগঠিত রক্ষণভাগ ও সম্ভাব্য প্রতিরোধ নরওয়ের সাফল্যকে থামাবে? ফুটবল বিশ্ব এখন সেই উত্তেজনাই দেখার অপেক্ষায়।






