বিশ্বকাপ শুরুর পর থেকেই আফ্রিকা মহাদেশের দল সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়ে তীব্র বিতর্ক চলছিল। ইতালির কোচ জেনারো গাত্তুসোসহ অনেকে এই সিদ্ধান্তে প্রশ্ন তোলেন। কিন্তু উত্তর আমেরিকার ৪৮ দলীয় এই টুর্নামেন্টে মাঠের পারফরম্যান্স দিয়েই আফ্রিকান দলগুলো তাদের সবচেয়ে সুরেলা জবাব দিয়েছে। আফ্রিকা থেকে সরাসরি ৯টি দেশ কোটা পায় এবং প্লে-অফে জেতার মাধ্যমে ডিআর কঙ্গোসহ মোট ১০টি দল বিশ্বকাপে অংশ নেয়; এদের মধ্যে কেবল তিউনিসিয়া বাদে বাকি ৯টি দল নকআউট পর্বে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। ৯০ শতাংশের এই সাফল্য ফিফার ছয়টি মহাদেশীয় অঞ্চলের মধ্যে সর্বোচ্চ—যেখানে দক্ষিণ আমেরিকার সফলতা ছিল ৮৩.৩৩% এবং ইউরোপের ৮১.২৫%।
নকআউট পর্বে যদিও ইউরোপীয় দলগুলো তাদের শক্তি দেখিয়েছে, আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব তেমনি 눈জড়ানো ছিল। এবারের আসরে আফ্রিকার হয়ে সবচেয়ে দূর পর্যন্ত যাত্রা করেছে মরক্কো; টানা দ্বিতীয়বার কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়া সত্ত্বেও শেষপর্যন্ত ফ্রান্সের কাছে হেরে বিদায় নিতে হয়েছে। এছাড়া মিশরও শেষ ষোলোতে পৌঁছায়। কিন্তু হয়ত সবচেয়ে মিষ্টি ও বিস্ময়ের গল্পটি এসেছে নৃশঙ্কর জনসংখ্যার দেশ কেপ ভার্দে থেকে—জনসংখ্যা মাত্র প্রায় ৫ লাখ, তবু তারা কোটি দর্শকের মন জয় করেছে। উদ্বোধনী ম্যাচে শক্তিশালী স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকানো এবং পরে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের বিরুদ্ধে ৩-২ হারলেও যে লড়াই দেখিয়েছে, তা চোখ কাড়ে। দলটির ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার অসাধারণ সেভ এবং সিদনি লোপেস কাব্রালের ছবি দৃশ্যমানে থাকা গোল এই টুর্নামেন্টের আলোচিত মুহূর্তগুলোর মধ্যে থাকবে।
তবে সাফল্যের সঙ্গে কিছু দুঃখের অধ্যায়ও ছিল। অনেক ম্যাচেই আফ্রিকান দলগুলো শেষ মুহূর্তে গোল হজম করেই জয় হাতছাড়া করেছে। শক্তিশালী আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ২-০ এগিয়ে থাকলেও মিশর শেষ পর্যন্ত ৩-২ ব্যবধানে হারায়; কঙ্গো ইংল্যান্ডের, আইভরি কোস্ট নরওয়ের কাছে হেরে বিদায় নেয়; এমনকি বেলজিকের বিপক্ষে দুই গোলে এগিয়ে থাকার পর অতিরিক্ত সময়ে হারিয়ে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যায় সেনেগাল। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এসব পরাজয়ের পেছনে প্রতিভার অভাব ছিল না—বরং ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনায় ফাঁকটাই সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়েছে।
এই দুর্বলতার বিষয়ে সাবেক ফরাসি তারকা থিয়েরি অঁরি মন্তব্য করেছেন, অনেক আফ্রিকান দল এগিয়ে গেলে মনোযোগ হারিয়ে ফেলে। অন্যদিকে জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ বলছেন, এটি কোনো দুর্ভাগ্য নয়—এটি দুর্বল ম্যাচ ব্যবস্থাপনার ফল। তবু সামগ্রিকভাবে দেখা গেছে যে, এই বিশ্বকাপে আফ্রিকার জন্য বাড়তি কোটা রাখার সিদ্ধান্ত কেবল সংখ্যাই বাড়ায়নি; প্রতিযোগিতার গুণগত মানকেও সমৃদ্ধ করেছে। শুরুতে যেসব সংশয় ছিল, মাঠের ফুটবল দিয়েই সেগুলোকে দলেরাই উত্থাপিত উত্তর দিয়েছে।
অবশেষে এই টুর্নামেন্ট আগামী কালে আফ্রিকান ফুটবলের উত্থানের লক্ষ্মণও দেখিয়েছে—গভীর প্রতিভা, সাহসী লড়াই এবং উন্মুক্ত আক্রমণভিত্তিক ফুটবলের মিশেলে সমগ্র বিশ্বকাপটি আরও প্রাণবন্ত হয়েছে। সমালোচকেরা যথার্থ জবাব পেয়েছেন, আর আফ্রিকান ফুটবল ভবিষ্যতে আরও বড় মঞ্চ দখলের প্রতিশ্রুতি দেখিয়েছে।






