মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় অনেক দেশ নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে বিকল্প জ্বালানির দিকে ফিরছে। সেইচক্রে নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে কয়লা — বিশেষত এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে কয়লা ব্যবহার ও আমদানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাজার বিশ্লেষক সংস্থা কেপলারের তথ্যানুযায়ী, চলতি মে মাসে বিশ্বজুড়ে কয়লা আমদানির পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ ৬৪ হাজার টন ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা ইতিহাসে কোনও মাসে করা তৃতীয় সর্বোচ্চ আমদানির রেকর্ডে পরিণত হতে যাচ্ছে। সাধারণত উত্তর গোলার্ধে শীত উত্তীর্ণ হওয়ার পর এই সময়ে কয়লার চাহিদা কমার কথা থাকলেও বর্তমান যুদ্ধ ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে চিত্রটি বদলে গেছে।
কয়লার বাড়তি চাহিদা আন্তর্জাতিক শিপিং খরচ ও জাহাজ সঙ্কটকে তীব্র করেছে। মার্কেট ডেটা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান আরগাস জানায়, গত ফেব্রুয়ারির তুলনায় মে মাসে কয়লা পরিবহনের ভাড়া গড়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বাড়েছে। ইন্দোনেশিয়া থেকে পণ্য পরিবহনের ভাড়া গত কয়েক মাসে প্রায় ৬০–৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, আর অস্ট্রেলিয়া থেকে জাহাজ ভাড়া ৪০–৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনার কারণে হরমুজ প্রণালীতে নৌ চলাচলে ঝুঁকি বাড়ায় কাতারসহ উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো এখন বিকল্প হিসেবে কয়লার দিকেৎ এগিয়ে আসছে।
এশিয়ার বৃদ্ধি পাওয়া চাহিদি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। থাইল্যান্ড তাদের বন্ধ করা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ধাপে ধাপে পুনরায় চালু করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া এলএনজির ওপর নির্ভরতা কমাতে পরিবেশগত কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করে কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়েছে; যুদ্ধের শুরুদিনের কয়েক সপ্তাহেই দেশটি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কয়লা থেকে প্রায় ৪ গিগাওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। জাপান ও ভিয়েতনামেও অনুরূপ প্রবণতা দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক শিপিং সংস্থা বিমকোর (BIMCO) তথ্যানুযায়ী, এপ্রিলে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে কয়লা সরবরাহ গত বছরের তুলনায় প্রায় ২৭ শতাংশ বাড়েছে। এর ফলে মাঝারি আকারের কয়লাবাহী পণ্যবাহী জাহাজগুলোর চাহিদাও তুঙ্গে উঠেছে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় কয়লা-ভোগী দেশ চিনও তাদের চাহিদা মেটাতে অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ব্যাপক পরিমাণ কয়লা সংগ্রহ করছে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হওয়ায় চীন কয়লা থেকে কেমিক্যাল তৈরির কারখানার উৎপাদন বাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন যে চলতি গ্রীষ্মে তীব্র তাপমাত্রা বাড়লে এয়ার কন্ডিশনার ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর চাহিদি বেড়ে যায়, ফলে কয়লার চাহিদাও আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
সাধারণত জুলাই থেকে শীতাভিশষ্য মজুদ করা হলেও বর্তমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে অনেক দেশ আগেভাগে মজুদ কার্যক্রম শুরু করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি সত্ত্বেও জ্বালানি নিরাপত্তা রক্ষার তাগিদে বহু দেশ এই দূষণকারী জ্বালানির দিকে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছে — যা ভবিষ্যতে জলবায়ু লক্ষ্য ও পরিবেশগত প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে।






